কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবারের নিউইয়র্ক ক্লাইমেট উইকের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, নাকি এর ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও কার্বন নিঃসরণ জলবায়ু সংকটকে আরও তীব্র করবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী, বিজ্ঞানী ও জলবায়ু কর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্ব নেতারা নিউইয়র্কে জড়ো হওয়ার সময়ই চলছে নিউইয়র্ক ক্লাইমেট উইক। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ও এআইয়ের পারস্পরিক প্রভাব এবার আন্তর্জাতিক নীতি ও বিনিয়োগ আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের শুরুতে এক বক্তব্যে এআই ও জলবায়ু সংকটের সম্পর্ক তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “জলবায়ু সংকট অস্থিতিশীলতা ও বাস্তুচ্যুতি বাড়ায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব চ্যালেঞ্জ সমাধানে সহায়তা করতে পারে, আবার পরিস্থিতিকে আরও খারাপও করতে পারে।”
বিশ্ব উষ্ণায়নকে শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বৈশ্বিক লক্ষ্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ায় এ বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব এমন এক পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে দ্রুত ও বড় পরিসরে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে ইতোমধ্যে জমা হওয়া কার্বন অপসারণের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এআইনির্ভর ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি তৈরি করছে পরিবেশগত চাপও।
এআই প্রযুক্তি পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নতুন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণে চাপ তৈরি হচ্ছে। গুগল ও মেটার মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক, ভূ-তাপীয়, বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন স্টার্টআপও উপকৃত হচ্ছে।
শিল্প খাতের অর্থবাজার পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান কারেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু প্রযুক্তি খাতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৫৫ শতাংশ বেশি। তবে এই বিনিয়োগের বড় একটি অংশ যাচ্ছে ডেটা সেন্টারকেন্দ্রিক প্রযুক্তি ও পরিষেবায়।
এর বিপরীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু প্রযুক্তি খাত তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। সেমাফোরের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কার্বন ব্যবস্থাপনা ও কম-কার্বন জ্বালানি খাতে এ বছর ভেঞ্চার বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এসব প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এদিকে ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ বিশ্বের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে। মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটা একসময় উচ্চাভিলাষী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের নিঃসরণ বেড়েছে। এআইয়ের বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এভলিন ওয়াং বলেছেন, নতুন ক্যাটালিস্টসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি আবিষ্কারের গবেষণা দ্রুততর করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরেও গতি আসতে পারে।
ওয়াং আরও বলেছেন, ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের কারণে জলবায়ু ও পানিসম্পদের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে এ পরিবর্তনে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র একবার নির্মিত হলে কয়েক দশক ধরে চালু থাকতে পারে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আশপাশের বাসিন্দারা শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ এবং স্থানীয় সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
নিউইয়র্ক ক্লাইমেট উইকের আলোচনায় তাই শুধু এআই জলবায়ু প্রযুক্তিতে কী ধরনের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আনতে পারে, সেই প্রশ্নই নয়, বরং এর সুফল কারা পাবে এবং সেই সুফলের বিপরীতে পরিবেশগত মূল্য কতটা দিতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এআইয়ের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “এআই নেতারা এখন পরিচালনার সামাজিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে পাতলা বরফের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন এবং জনসমর্থনের দিক থেকে গভীর পানিতে ডুবে যাচ্ছেন।”
স্টিয়েল প্রযুক্তি খাতের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এআইয়ের দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যয়ের তুলনায় এর সুফল কীভাবে বেশি হতে পারে, তা তাদের দেখাতে হবে।
নিউইয়র্ক ক্লাইমেট উইকের আলোচনায় এআই ঘিরে যে বিতর্ক সামনে এসেছে, তা জলবায়ু বিশ্বের একটি বড় দ্বিধাকে তুলে ধরছে। একদিকে এআই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করতে পারে, অন্যদিকে এর বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা ও সংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।


