সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধু ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ-বিদেশে এর চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে কমছে উৎপাদন। গত পাঁচ বছরে সুন্দরবনের মধু উৎপাদন প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যাওয়ায় বাজারে তৈরি হয়েছে সংকট। এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। ফলে বাড়ছে ভেজাল মধুর দাপট, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রেতারা এবং প্রশ্নের মুখে পড়ছে সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী এই বনজ সম্পদের সুনাম।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বনদস্যুদের তৎপরতা, অভয়ারণ্যের বিস্তার এবং মধু আহরণের সময় কমিয়ে আনার কারণে সুন্দরবনে মধু উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের হিসাব বলছে, ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ১০৪ দশমিক ৪ মেট্রিক টন মধু সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরের বছর ২০২২ সালে উৎপাদন কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫ মেট্রিক টনে। তবে এরপর থেকেই শুরু হয় পতন। ২০২৩ সালে উৎপাদন নেমে আসে ৯৫ মেট্রিক টনে। ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে ১০০ মেট্রিক টন হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ৭ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মৌসুমে উৎপাদন আরও কমে হয়েছে মাত্র ৪২ দশমিক ১ মেট্রিক টন।
মধু উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়েও। বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কুইন্টাল মধুর জন্য ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং মোমের জন্য ২ হাজার ২০০ টাকা রাজস্ব নির্ধারিত রয়েছে।
২০২২ সালে ৩ হাজার ৮ কুইন্টাল মধু ও ৬৯৬ কুইন্টাল মোম আহরণ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৫২ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ টাকা। তবে উৎপাদন কমতে থাকায় রাজস্ব আয়ও কমেছে। ২০২৫ সালে মধু আহরণ কমে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে নেমে এলে রাজস্ব দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকায়।
চলতি বছরের এপ্রিল-মে মৌসুমে অনাবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দস্যু আতঙ্কের কারণে মধু আহরণ আরও কমে ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টালে দাঁড়িয়েছে। এ বছর সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকা। এর মধ্যে মধু থেকে এসেছে ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ টাকা।
উৎপাদন কমলেও বাজারে বেড়েছে সুন্দরবনের মধুর দাম। বর্তমানে প্রকারভেদে প্রতি কেজি মধুর দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু সেই বাড়তি দামও মৌয়ালদের জীবনে স্বস্তি আনতে পারেনি। কারণ বনে যাওয়ার পথে তাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে দস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের ঝুঁকি।
মৌয়াল ছগির হাওলাদার বলেন, “১০ জনের দল নিয়ে বনে গিয়েছিলাম। বনদস্যু মেজো জাহাঙ্গীর বাহিনী আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে দুইজনকে অপহরণ করে। দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়াতে হয়েছে। আড়াই লাখ টাকা খরচ করে মাত্র দুই মণ মধু পেয়েছি। এখন ঋণের বোঝা নিয়ে ফিরেছি।”
পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনের মধুর প্রধান উৎস খলিশা, গরান ও কেওড়া গাছে এবার পর্যাপ্ত ফুল না ফোটায় উৎপাদন কমেছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের পরিধি বৃদ্ধি এবং মধু আহরণের সময় তিন মাস থেকে কমিয়ে দুই মাস করায় মৌয়ালদের সুযোগও সীমিত হয়েছে।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি জাতীয় সম্পদের মর্যাদা বাড়িয়েছে। তবে এই সম্পদ রক্ষায় মৌয়ালদের নিরাপত্তা, সহজ শর্তে ঋণ, বিশেষ বীমা এবং ভেজাল নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “স্মার্ট পেট্রোলিং জোরদার, ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার চালু এবং কিউআর কোডভিত্তিক সরকারি সিল চালু করা গেলে সুন্দরবনের মধুর মান ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, দস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের কারণে অনেক মৌয়াল গভীর বনের মধু আহরণ এলাকায় যেতে পারেননি। এতে উৎপাদনের পাশাপাশি রাজস্বও কমেছে। মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উৎপাদন সংকট, ভেজাল মধুর বিস্তার এবং মৌয়ালদের নিরাপত্তাহীনতা দ্রুত মোকাবিলা করা না গেলে জিআই স্বীকৃতির প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। সুন্দরবনের এই অনন্য বনজ সম্পদ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।


