
ফুটবলের দেশ ব্রাজিলে প্রতিভায় মোড়ানো রূপকথা নতুন কিছু নয়। বস্তির অন্ধকার জগৎ থেকে উঠে এসে পেলের বিশ্বজয় কিংবা রোনালদিনহোর জাদুকর হয়ে ওঠার গল্পে ফুটবল রোমান্টিকদের বুক ভারী হয়েছে বহুবার। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে কার্লো আনচেলত্তির ২৬ জনের দলে ২৪ বছর বয়সী নম্বর নাইন ইগর থিয়াগোর নাম খোদাই হলো, তখন ব্রাজিলের ইতিহাসে যোগ হলো সেই পুরোনো ঐতিহ্যের এক নতুন মলাট।
ইগরের গল্পের শুরুটা ব্রাসিলিয়ার উপশহর গামায়, চরম অনটন আর দারিদ্র্যের মাঝে। মাত্র তেরো বছর বয়সে আকস্মিক এক ঝড়ে হারান নিজের বাবাকে। অকুল পাথারে পড়া সংসার সচল রাখতে মা মারিয়া দিভা করতে থাকেন রাস্তায় ঝাড়ুদারের কাজ। বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারায় দিনের পর দিন ঘরে জ্বলত না আলো; সামান্য সাহায্যের জন্য আত্মীয়দের দুয়ারে গিয়েও হতে হয়েছিল চরম অপমানিত। মায়ের সেই নিঃশব্দ কান্না আর কষ্ট দেখেই কিশোর ইগরের বুকে জেদ চেপে বসেছিল ভাগ্য বদলানোর।
সম্প্রতি ইএসপিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইগর বলেন, ‘বাবা চলে যাওয়ার পর আমাদের টিকিয়ে রাখতে মাকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়েছে। তিনি ছিলেন প্রতিকূলতা জয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মাকে দেখেই আমার মনে জেদ চেপেছিল—আমি তাকে পুরো পৃথিবীটা দিতে চাই। যেভাবে পারি আমাদের পরিবারের পরিস্থিতি বদলে দিতে চাই।’
মায়ের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে কিশোর বয়সেই ইগর রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজে নামেন। কখনো বাজারে ফল বিক্রি, আবার কখনো রোদে পুড়ে বিলি করেছেন লিফলেটও। ফুটবলের প্রতি তীব্র টান থাকলেও স্থানীয় বিভিন্ন ক্লাবের ট্রায়াল থেকে একের পর এক প্রত্যাখ্যান আসায় একসময় তীব্র হতাশায় বুট তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু মা ছেলের হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন ভেঙে না পড়তে । ইগর বলেন, ‘আমার মা-ই আমাকে স্বপ্ন বিসর্জন না দেওয়ার শক্তি দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন যেন আমি অনেক আগে তাকে দেওয়া একটি কথা রক্ষা করি এবং কোনো অবস্থাতেই হাল না ছাড়ি।’
মায়ের চোখের জল যেন শেষ পর্যন্ত ছেলের পায়ে ডানা মেলে দিয়েছিল। রাতে যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে থাকত, ইগর একা একা ১০ কিলোমিটার করে দৌড়াতেন। অবশেষে তাঁর সেই কঠোর পরিশ্রমের ফল মেলে। ২০১৮ সালে ভেরে ক্লাবের যুব দলে সুযোগ পেয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপে ১৩ গোল করে দলকে শিরোপা জেতান তিনি। সেখান থেকেই ইগরের প্রতিভার দ্যুতি দেখে তাঁকে সই করায় ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ক্রুজেইরো।
কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ছিল না। ক্লাবটি তীব্র আর্থিক সংকটে ডুবে রেলিগেটেড হয়ে গেলে সমস্ত দায় এসে পড়ে তরুণ ইগরের ঘাড়ে। তীব্র সমালোচনা ও গণমাধ্যমের কড়া বাণে ইগর মানসিক ট্রমায় পড়ে যন।
তবে যার ধমনিতে লড়াইয়ের রক্ত, সে তো এত সহজে হার মানতে পারে না। কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিও ক্রুজেইরোর মালিকানা নেওয়ার পর ইগরের প্রতিভা অনুধাবন করেন এবং তাকে ৭ লাখ ডলারে বিক্রি করে দেন বুলগেরিয়ার ক্লাব লুদোগোরেতসে।
ইউরোপের মাটিতে পা রাখাই ছিল ইগরের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। লুদোগোরেতসের হয়ে ঘরোয়া ট্রেবল জেতার পর, বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুগায় গিয়ে এক মৌসুমে করেন ২৯ গোল।
ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে ইগর যোগ দেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেন এই তারকা। কিন্তু ইংল্যান্ডে পা রেখেই হাঁটুতে চোট ও ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়ে টানা ২৭৩ দিন মাঠের বাইরে ছিটকে যান। ব্রেন্টফোর্ড ম্যানেজার থমাস ফ্রাঙ্ক অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘এই জয়েন্ট ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি চিকিৎসাবিজ্ঞানে খুবই কম। কিন্তু ইগরের ক্ষেত্রে মনে হলো অবাস্তব কিছুই বাস্তব হয়ে গেল।’
চোটের বিভীষিকা মাড়িয়ে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ২২ গোল করে ইগর ঠিকই জাত চেনান নিজের। এক মৌসুমে তাঁর চেয়ে বেশি গোল করতে পারেননি আর কানো ব্রাজিলিয়ান। শুধু তা–ই নয়, আর্লিং হালান্ডকে টক্কর দিয়ে জিতে নেন মাসসেরার পুরস্কারও। বিধ্বংসী এই ফর্মই তাঁকে এনে দেয় ব্রাজিলের জার্সি।
গত মার্চে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি পেলে গ্যালারির হাজারো সমর্থক তার সামর্থ্য নিয়ে দুয়ো দিচ্ছিলেন। কিন্তু কোচ আনচেলত্তির আস্থায় ইগর ঠান্ডা মাথায় গোল করেন। শৈশবের সব অপমানের জবাব দিয়ে সেই গোল ছিল আত্মহননের চিন্তা থেকে ফিরে আসার এক চিৎকার।
বিশ্বকাপ দলে ইগরে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কারও সমালোচনা থাকার কথা নয়। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির এই স্ট্রাইকারের ব্রাজিলের খাঁটি নাম্বার নাইন হওয়ার সব উপাদানই আছে। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে ফেলা, হোল্ড-আপ প্লে এবং এরিয়াল বলে আধিপত্য দেখানোই তাঁর মূল শক্তি। যদিও মূল একাদশে জায়গা পেতে কঠিন লড়াই করতে হবে। তবে বিশ্বাসের জোরে ভাগ্য বদলে দেওয়া অকুতোভয়ীকে এবার বিশ্বমঞ্চে আটকানোর সাধ্য কার!


