
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকায় দেশে এসব মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। একই সময়ে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পাচ্ছেন বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং সমাধান” শীর্ষক গবেষণার ফলাফল শনিবার (২ মে) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে এক পরামর্শ সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভার আয়োজন করে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি (সেলপ)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেও এটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। বাজেট বৈষম্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পুরো বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ যেখানে প্রায় ২২০০ কোটি টাকা, সেখানে শুধু বিটিভির বাজেটই প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মামলা রয়েছে, যা কমিয়ে ৪ লাখে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘসূত্রতা, আইনজীবীদের কৌশল এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে মামলার জট বাড়ছে।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা এই চার খাতে সেবার মানই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা নির্ধারণ করে। বাজেট বাড়ালেই সমাধান আসবে না, বরং জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ভিকটিম কেন্দ্রিক বিচার প্রক্রিয়া, সময় কমানো এবং মিথ্যা মামলায় শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন জানান, সহিংসতার শিকার নারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ সামাজিক চাপ ও কলঙ্কের কারণে আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। ফলে প্রকৃত চিত্র অনেক সময় সামনে আসে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে গড়ে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে প্রায় ৩.৭ বছর বা ১৩৭০ দিন। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার তারিখ পড়েছে।
অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণ, এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাবকে বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষকরা সুপারিশ করেছেন, মামলার অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো, তদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্ট দ্রুত নিশ্চিত করা, সাক্ষী সুরক্ষা জোরদার করা এবং ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
ব্র্যাক জানায়, ২০২৫ সালে তাদের আইনি সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। এছাড়া প্রায় ১১ লাখ মানুষকে আইনি সচেতনতা দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের কার্যকারিতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


