
নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট ইউনিভার্সিটি এবং ওয়াগেনিনজেন ইউনিভার্সিটি এন্ড রিসার্চ-এর সঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। ‘কালচার্স অব এডাপটেশন নেটওয়ার্ক (সিএএন)’ নামের এই উদ্যোগের মাধ্যমে গত বছর থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তন, অভিযোজন, জীবিকা, অভিবাসন ও সামাজিক সহনশীলতা নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় যৌথ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে উট্রেখট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ মল্লিক-এর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় এ আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে সিএএনের অন্যতম স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে কাজ করছে।
এই সহযোগিতার অংশ হিসেবে সিএএনের উদ্যোগে নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট ইউনিভার্সিটিতে আজ ৩০ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ: ক্লাইমেট এন্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক দু’দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক গবেষণা সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করছে। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ নাজমুস সাদাত, অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ নাসিফ আহসান, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ আশিক উর রহমান এবং ড্রইং এন্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক শাপলা সিংহ।
আজ ৩০ জুন (মঙ্গলবার) সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো পূর্বাভাস নয়, এটি এখন আমাদের বাস্তবতা। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততার বিস্তার, তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব অনুভব করছে। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
তিনি বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়, প্রতিটি জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার প্রতিটি বৃদ্ধি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
উপাচার্য জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন পাইকগাছায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় একটি অফশোর ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ ক্যাম্পাসকে একটি ‘লিভিং ল্যাব’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকরা উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জীববৈচিত্র্য ও অভিযোজন কৌশল নিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে গবেষণা পরিচালনার সুযোগ পাবেন। বাস্তবভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গবেষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এই অফশোর ক্যাম্পাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, সিএএন ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে এমন সহযোগিতা কতটা কার্যকর হতে পারে। গত বছর সফলভাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্তর্জাতিক সামার স্কুল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছর সেই সামার স্কুল এবং এই গবেষণা সেমিনার উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন দেশের গবেষকরা পানি, অভিবাসন, সহনশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জেন্ডার, সুশাসন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপন করছেন। একই সঙ্গে সম্মেলনের কর্মসূচিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সঙ্গে ডাচ গবেষকদের যৌথ গবেষণার ফলাফলও তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের সহনশীলতা এবং কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষণা। এটি শুধু ভাবনার আদান-প্রদান নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার একটি নতুন সূচনা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এইচ. ই. ফাইয়াজ মুর্শিদ কাজী, উট্রেখট ইউনিভার্সিটির জিওসায়েন্স অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ. উইজেল, এনডব্লিউও এডিএম ল্যাব কর্মসূচির লিলিয়ান স্বিরের এবং উট্রেখট ইউনিভার্সিটির এসজিপিএল বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. ই. বুইটেলার।
এডিএম ল্যাবের চারটি গবেষণা প্রকল্পের ওপর সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা করেন ওয়াগেনিনজেন ইউনিভার্সিটি এন্ড রিসার্চের সৈয়দ মুস্তাফা ও স্যামুয়েল জনসন সুতান্তো এবং উট্রেখট ইউনিভার্সিটির ফ্রান্সেস ডান ও ড. বিশ্বজিৎ মল্লিক। এসব প্রকল্পের অধিকাংশের সঙ্গেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্পৃক্ত রয়েছেন। এছাড়া সেমিনারে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রইং এন্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক শাপলা সিংহ একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করবেন।
দুই দিনব্যাপী এ সেমিনারে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, অভিযোজন, টেকসই উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ে ৩২টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপভিত্তিক গবেষকরাও তাঁদের গবেষণার ফলাফল ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। এতে বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করছেন।
সেমিনার শেষে আগামী ৬ থেকে ১০ জুলাই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সামার স্কুল অনুষ্ঠিত হবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র, অভিযোজন কৌশল ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সামার স্কুলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোঃ নাজমুস সাদাত, প্রফেসর ড. মোঃ নাসিফ আহসান এবং প্রফেসর ড. মোঃ আশিক উর রহমান গেস্ট লেকচারার হিসেবে লেকচার প্রদান করবেন।


