দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে অবহেলায় পাবনা শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। খানাখন্দে ভরা এসব সড়কে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। আবার সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। বর্ষায় হাঁটুসমান পানিতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। পৌর শহরের বেশ কয়েকটি জায়গায় ঘুরে দেখা গেছে, শহরের প্রবেশপথ মুজাহিদ ক্লাব থেকে পাবনা শহর পর্যন্ত সড়কটি একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যেখানে খানাখন্দে ভরা সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু পর্যন্ত পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অল্প বৃষ্টিতেই ডিঙি নৌকা নিয়ে চলাচল করা যায়। এতে যেন হারিয়ে গেছে রাস্তার মানচিত্র৷ তাতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সড়ক পাবনা শহর থেকে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল সড়ক, বড়বাজার সড়ক, শালগাড়িয়া গোরস্থান সড়কসহ বেশ কয়েকটি সড়কের রাস্তায় বিটুমিন আর খোয়া উঠে সড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। এসবে জমে আছে বৃষ্টির পানি। তাই ঝুঁকি নিয়েই চলছে যানবাহন। আর প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। হাসপাতাল সড়কের বেহাল দশায় চলাচলরত রোগীদের ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে।
বিশেষ করে সদ্য অপারেশনকৃত ডেলিভারি, অর্থপেডিক রোগীদের জন্য ভোগান্তির সড়ক এটি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ থাকলেও নজর দেয়নি কেউ। দ্রুত এসব রাস্তা দ্রুত মজবুত সংস্কারের পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতির দাবি জানান তারা।ছাতিয়ানী, বাজিতপুর রোড় বাইলেন বাবলাতলা, নয়নামতি, শালগাড়িয়া যুগিপাড়া পাড়ার বেশ কিছু সড়ক বর্ষা মৌসুম জুড়েই পানির নিচে ডুবে থাকে। লতিফ টাওয়ার থেকে খেয়াঘাট সড়ক, শালগাড়িয়া গোরস্থান সড়ক শহরের ১ ওয়ার্ড গোবিন্দার এলাকার ব্যস্ত সড়কেরও বেহাল দশা। কালেক্টরেট স্কুলের সামনে থেকে ভূমি অফিস মোড় পর্যন্ত ব্যস্ততম রাস্তাটি খানাখন্দে ভরে গেছে। মাসুম বাজারের জামেয়া আশরাফিয়া, মাদরাসা থেকে চেতনের মোড় পর্যন্ত রাস্তাটি, বাংলা ক্লিনিক থেকে হোমিওপ্যাথি কলেজ পর্যন্ত, ইয়াকুর ফিলিং স্টেশন থেকে খাদিজাতুল কোবরা মহিলা মাদরাসা সড়ক, জুবলী ট্যাংক থেকে স্কয়ার সড়ক হয়ে শাপলা প্লাস্টিক মোড়, লালবাগ মোড় থেকে ইংলিশ রোড, মালিগলী স্কুল রোড সহ অর্ধ শতাধিক সড়কের রাস্তায় বিটুমিন আর খোয়া উঠে সড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দে ভরপুর। এ ছাড়া, পৈলানপুর মোড় থেকে বিসিক শিল্প নগরীর সড়ক হয়ে মানসিক হাসপাতালের সড়ক ও চলাচলের বেহাল দশা।
পৌর সদরের শিবরামপুর মহিষের ডিপো এলাকা থেকে শুরু করে শুরু করে কালাচাঁদপাড়া, শালগাড়ীয়া, আটুয়া মোড়, বেলতলা রোড, গোপালপুর, দিলালপুর, দক্ষিণ রাঘবপুর, দোহারপাড়া, আরিফপুর মধ্যপাড়া, শালগাড়িয়া, কুঠিপাড়া, রাধানগর, মক্তব মোড়, যুগীপাড়া, মনসুরাবাদ আবাসিক এলাকা বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে থাকে। শালগাড়ীয়া এলাকার বাসিন্দা আতাউর রহমান নামের একজন বলেন, পাবনা পৌরসভা একটি প্রথমশ্রেণির পৌরসভা হলেও আজ পর্যন্ত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। অধিকাংশ শহরকই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এসব রাস্তাগুলো খানাখন্দে ভরে গেলেও সংস্কারের উদ্যোগে নেওয়া হয় না। অথচ আমরা ট্যাক্স দিয়েই এখানে বসবাস করি। বিগত দিনগুলোতেও এসব রাস্তায় উন্নয়ন করা হয়নি। বর্তমানেও কোনো ধরনের উন্নয়ন করা হচ্ছে না। তাই পৌরসভা কর্তৃপক্ষের নজরদারি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।আব্দুল্লাহ আল কাফি নামের এক পথচারী বলেন, মুজাহিদ ক্লাব থেকে শহর, শহর থেকে পাবনার জেনারেল হাসপাতাল সড়কের বেহাল দশা। রোগীদের চলাচলে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ডেলিভারি রোগীরা বেশি নাজেহালের শিকার হচ্ছে।
পাবনা শহরের শালগাড়িয়ার আইডিয়াল গ্রুপের পরিচালক আবু দাউদ বলেন, আমাদের অনেক শিক্ষার্থী শহরের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে। ক্যাম্পাসে আসতে নাজেহালের শিকার হতে হয়। হাসপাতালে রোগী আসতে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা সংস্কার করে চলাচলে উপযোগী করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান তিনি। পাবনার লতিফ গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার অচিন্ত কুমার ঘোষ বলেন, পাবনা পৌর এলাকার সব পানি নিষ্কাশন হয় মূলত দোহারপাড়া ও আরিফপুর-সংলগ্ন বুড়িদাহ কালভার্টের নিচের খাল দিয়ে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের ওই খালটি দখল-দূষণে সরু হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত গতিতে বের হতে পারছে না। তাই দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল দখলমুক্ত ও খনন করে প্রসার করতে হবে। এ জন্য পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পাবনা পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. ওবায়েদ উল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন, আতাইকুলা রোড, নয়নামতি সড়ক টেন্ডার হয়ে গেছে। হসপিটাল রোডের টেন্ডার চলমান। ড্রেনেজ ব্যবস্থার যে সমস্যা আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। জনগণ যাতে এখান থেকে পরিত্রাণ পায় সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের নতুন এমপি মহোদয় অনেক পজেটিভ মানুষ উনি। উন্নয়নের জন্য আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পাবনা পৌরসভার মধ্যে মোট ২৪০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে। যার প্রায় অর্ধেকই সংস্কারের প্রয়োজন। আর এসব রাস্তায় মোট ড্রেন রয়েছে ১১৯ কিলোমিটার। পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি মাত্র জেলাতে নতুন যোগদান করেছি। পৌরসভার রাস্তাঘাটের বেহালদশার বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
১৯৮৯ সালে পাবনা পৌরসভা ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ২৭ দশমিক ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় পাকা সড়ক রয়েছে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার।এ ছাড়া, পৌর শহরের মধ্যে জরুরি সেবার দুটি লাশবাহী গাড়িই নষ্ট হয়ে গেছে। মোট ১২টি ময়লার গাড়ির মধ্যে বেশ কয়েকটা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এতে করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চরম ব্যাহত হচ্ছে। শহরে অনেক অলিগলি রাস্তায় রোড লাইট নষ্ট থাকায় সন্ধ্যার পর সেখানে মাদক কেনাবেচা চলছে দেদারছে। উঠতি বয়সী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা বাদ দিয়ে মাদক ও মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এমন পরিবেশ পেয়ে মাদকের রমরমা বাণিজ্য করে বেড়াচ্ছে। কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে। যার ফলে আইনশৃঙ্খলা ব্যাপক অবনতি শুরু হয়েছে। শহরের পলাশ ক্যাডেট স্কুলে রাফিয়া ইসলাম নামের এক মহিলা ছোট শিশুকে পড়াতে আসছেন। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে আজ চার মাস হলো এখানে ভর্তি করেছি। প্রতিদিন সকালে টার্মিনালের বাসা থেকে ছেলে স্কুলে নিয়ে আসতে হয়। রাস্তাগুলোর বেহাল দশা থাকায় বাচ্চারা গাড়িতে চড়ে প্রায়ই অসুস্থ হচ্ছে। অনেক সময় এসব খানাখন্দের জন্য বাচ্চারা স্কুলে আসতে অনিহা প্রকাশ করে।
মাসুম বাজারের মুরগী ও ডিম ব্যবসায়ী সেলিম উদ্দিন বলেন, আমরা এই সরকারের কাছে কোনকিছুই চাই না। শুধু আমাদের মাসুম বাজার থেকে চেতনের মোড় পর্যন্ত রাস্তাটুকু মেরামত করে দেওয়া হোক। এই হাটে ভোর থেকে সন্ধা রাত পর্যন্ত বিশাল মাছ ও মাংশের আড়ত বসে। অসংখ্য মানুষের পদচারণা থাকলে বছরের পর বছর কোনো জনপ্রতিনিধি রাস্তাটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি। আমাদের ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়৷ পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, শহর থেকে হাসপাতালগামী বিভিন্ন সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ ছাড়া, সড়কটি প্রশস্ত না থাকায় যানজট লেগেই থাকে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান হলে পাবনাবাসী উপকৃত হবে। সেইসঙ্গে রোগীরা একটু হলেও স্বস্তি পাবে।


