
মোংলা বন্দরে সমুদ্রগামী জাহাজের কারণে অনেক বর্জ্যর সৃষ্টি হয়। এই বর্জ্যের কারণে অনেক সময় সুন্দরবনের পরিবেশও নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। এই অবস্থায় মোংলা বন্দরে আগত সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে বর্জ্য দূষণ থেকে সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার্থে সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা ‘পোর্ট রিসিপশন ফ্যাসিলিটি’ (পিআরএফ) প্রকল্পটি পরিবেশ দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন নৌ-পরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে মোংলা বন্দরের শিল্পাঞ্চলের নদীর পাড়ে নবনির্মিত পোর্ট রিসিপশন ফ্যাসিলিটি (পিআরএফ) (আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা) শীর্ষক প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
উদ্বোধনকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, এই প্রকল্প চালুর ফলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে সমুদ্রে তেল ও ক্ষতিকর বর্জ্য অবৈধভাবে নিষ্কাশন রোধ, মৎস্য সম্পদ ও জলজ আবাসস্থল সংরক্ষণ, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ বন্দর হিসেবে মোংলা বন্দরের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজ থেকে বর্জ্য সংগ্রহ ও শোধন ফি আদায়ের মাধ্যমে বন্দরের জন্য নতুন আয়ের একটি টেকসই উৎস সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণপ্রবাহ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্তমানে খাদ্যশস্য, সার, কয়লা, তেল, সিমেন্ট ক্লিংকার, এলপিজি গ্যাস, মোটরগাড়ি ও মেশিনারিজ আমদানির পাশাপাশি গার্মেন্টস পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, সাদা মাছ, পাট ও পাটজাত দ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। আধুনিক পিআরএফ প্রকল্প সংযোজনের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহীন রহমান।
এছাড়া মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সিনিয়র উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. মাকরুজ্জামান, সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (অর্থ) ও পরিচালক (প্রশাসন) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কাজী আবেদ হোসেন (যুগ্মসচিব), সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান (যুগ্মসচিব), পরিচালক (বোর্ড) কালাচাঁদ সিংহ (যুগ্মসচিব) এবং হারবার মাস্টার ও প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম সহ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সকল বিভাগীয় প্রধান, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধন শেষে নৌ-পরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন পোর্ট রিসিপশন ফ্যাসিলিটি (পিআরএফ) প্রকল্পটি ঘুরে দেখেন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ১১৪ কোটি ৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত পোর্ট রিসিপশন ফ্যাসিলিটি প্রকল্প। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক MARPOL কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে সামুদ্রিক দূষণ রোধে অঙ্গীকারবদ্ধ। আন্তর্জাতিক এই কনভেনশনের আওতায় আন্তর্জাতিক বন্দরসমূহে কার্যকর ও আধুনিক পোর্ট রিসেপশন সুবিধা ( পিআরএফ) পরিচালনা একটি বাধ্যতামূলক মানদণ্ড। মোংলা বন্দরে নবনির্মিত এই পিআরএফ স্থাপনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ ও দুর্ঘটনাকবলিত জলযান থেকে নির্গত বর্জ্য ও তেল আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংগ্রহ, পরিশোধন ও নিষ্কাশনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সংযোজন করা হয়েছে ২টি তেল অপসারণকারী জলযান, ১টি বর্জ্য সংগ্রহকারী জলযান, একটি আধুনিক পিআরএফ প্লান্ট, ১টি ডাম্প বার্জ, ১টি সেল্ফ প্রপেল্ড বার্জ, ১টি সার্ভিস টাগ বোট, ১টি পন্টুনসহ প্রয়োজনীয় জেটি ও ইয়ার্ড। এসব অবকাঠামো ও সরঞ্জামের মাধ্যমে মোংলা বন্দর এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বন্দরে পরিণত হয়েছে। যার ফলে জাহাজের বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা রোধ করা যাবে এবং সুন্দরবনকে দূষণ থেকে রক্ষা করা যাবে।
পোর্ট রিসেপশন ফ্যাসিলিটির কার্যক্রম শুরু হয় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বিশেষায়িত জলযানের মাধ্যমে বহিনোঙর ও বন্দরে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে দূষিত তেল ও বর্জ্য সংগ্রহ করে প্লান্টের নিজস্ব জেটিতে এনে বিশেষায়িত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে পরিশোধনের ধরন নির্ধারণ করে দক্ষ প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় বর্জ্য শোধন করা।
নবনির্মিত পিআরএফ প্লান্টে বর্জ্য শোধনের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তৈলাক্ত বর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে প্রায় ৮৫ শতাংশ পানি, ১২ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি এবং ৩ শতাংশ ছাই উৎপাদিত হয়। এসব জ্বালানি বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কাঁচামাল ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নবনির্মিত ‘পোর্ট রিসিপশন ফ্যাসিলিটি’ মোংলা সমুদ্র বন্দরকে আরো আধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব করে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষার নিয়ম মেনে চলতে সাহায্য করবে।


