
‘বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে। গবেষণা বলছে- দেশের আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৬ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকারের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশে ২ হাজার ১১৩টি যৌন হয়রানি এবং ৯ হাজার ২৯৫টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।’
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (এসজিবিভি) প্রতিরোধে সাভারে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রধান ক্যাম্পাসে আলোচনা সভায় এমন তথ্য জানালেন বক্তারা।
বুধবার (২০ মে) বিকালে ‘বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্র ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে জনপরিসরে যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার অবসান’ শীর্ষক সভার আয়োজন করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন হয়রানি ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন আসকের উপদেষ্টা মাবরুর মোহাম্মদ।
আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমানের ভাষ্য, ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০, গৃহসহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ নারীর সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
তিনি যোগ করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্র ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে জনপরিসরে যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার অবসান প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে আসক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সার্বিক সমন্বয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ছাড়াও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত হবে এ কার্যক্রম।
সভায় ‘হোল অব স্কুল’ পদ্ধতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতিমালা ও জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করা, অভিযোগ প্রতিরোধ কমিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের চেঞ্জমেকার গ্রুপ গঠন, নারী নিরাপত্তা নিরীক্ষা, সামাজিক আচরণ পরিবর্তনমূলক কার্যক্রম এবং ক্যাম্পাসে জিরো টলারেন্স সংস্কৃতি গড়ে তোলা। ২০২৬ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স (টিওটি), ওয়েবিনার, অ্যাডভোকেসি ডায়ালগ, ক্যাম্পেইন, সেফটি অডিট, রেফারেল মেকানিজম ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সমন্বয়সভাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম।
অনুষ্ঠানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিসিপ্লিনারি কমিটির চেয়ারম্যান ও ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সের ডিন অধ্যাপক ড. এম মাহবুব উল হক মজুমদার উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ডিসিপ্লিনারি কমিটি ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সম্প্রতি যৌন হয়রানির অভিযোগে এক শিক্ষককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফ্যাকাল্টি অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস বিভাগের ডিন ড. লিজা শারমিনের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হওয়া উচিত বাবা-মায়ের মতো। যৌন হয়রানির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেক সময় আইনের চেয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
তার ভাষ্য, ৩১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যেকোনো ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসন দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির চেষ্টা করে। পাশাপাশি মানসিক ট্রমা মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি টিম নিয়মিত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন, ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়মিত আয়োজন করা হয়। নতুন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি সেমিস্টারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা যৌন হয়রানি ও সহিংসতার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন, যোগ করেন তিনি।


