
জাকারিয়া হোসাইন শাওন :: একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ, সরকারি অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতার নানা প্রশ্ন। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন একদল তরুণ উদ্যোক্তা—যাঁরা নিজেদের সঞ্চয়, ব্যাংকঋণ ও ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে তুলেছেন ইকো-ট্যুরিজমভিত্তিক রিসোর্ট ও পর্যটনসেবা।
উদ্যোক্তাদের দাবি, তাঁদের উদ্যোগ শুধু পর্যটকদের জন্য থাকার ব্যবস্থা কিংবা বিনোদনের সুযোগ তৈরি করছে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকার সুযোগ। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি তাঁদের সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে আরেক বাস্তবতা—বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদন ও ছাড়পত্রের দীর্ঘসূত্রতা।
বননির্ভরতা থেকে পর্যটন অর্থনীতিতে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা ঐতিহাসিকভাবে বননির্ভর। মাছ ধরা, গোলপাতা ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করেই চলেছে স্থানীয় অর্থনীতি। পরিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের একটি জায়গা হলো—অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত বননির্ভরতা সুন্দরবনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এমন বাস্তবতায় ইকো-ট্যুরিজমকে বিকল্প জীবিকার একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে স্থানীয় মানুষ যুক্ত হচ্ছেন। কেউ রিসোর্টে কর্মী হিসেবে, কেউ নৌযানের চালক বা সহকারী হিসেবে, আবার কেউ গাইড, খাবার সরবরাহ কিংবা অন্যান্য সেবায় যুক্ত হচ্ছেন।
উদ্যোক্তাদের দাবি, এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বননির্ভরতা ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে বৈধ ও সম্মানজনক পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য—সঠিক পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে ইকো-ট্যুরিজম সুন্দরবনের জন্য হুমকি নয়; বরং সংরক্ষণ ও স্থানীয় অর্থনীতির মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হতে পারে।
কিন্তু উদ্যোক্তাদের সংকট কোথায়?
প্রশ্ন উঠছে, যারা পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছেন, তাঁদের প্রধান বাধা কী?
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনার চেষ্টা করেও তাঁদের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট-ট্যাক্স,ফায়ার লাইসেন্স, RJSC নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা Environmental Impact Assessment (EIA) করানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে EIA সম্পন্ন করে জেলা প্রশাসনের কাছে অনুমোদনের আবেদনও করা হয়েছে।
এরপরও বিভিন্ন অনুমোদন ও ছাড়পত্রের জন্য একের পর এক সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ বলছেন, একটি ইকো-রিসোর্টের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত সরকারি দপ্তর বা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এখানেই তাঁদের প্রশ্ন—যদি সরকারের নীতিতেই সমন্বিত সেবা ও One Stop Service-এর কথা বলা থাকে, তাহলে বাস্তবে কেন উদ্যোক্তাকে এতগুলো দপ্তরের দরজায় ঘুরতে হবে?
নীতিমালা বনাম মাঠের বাস্তবতা
জাতীয় পর্যটন নীতি ২০১০-এ সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিমালার ৩.২.২ ধারায় সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন সুবিধা তৈরির পাশাপাশি পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা বা ECA-তে ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় পর্যটন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নীতিগতভাবে সরকারের অবস্থান হলো—সুন্দরবনকে রক্ষা করেই সেখানে টেকসই পর্যটন গড়ে তুলতে হবে।
কিন্তু উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এই সমন্বয়ের বাস্তব কাঠামো এখনও তাঁদের কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে পরিবেশগত ছাড়পত্র, পর্যটন অনুমোদন, স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোন পর্যায়ে যোগাযোগ করতে হবে—এ নিয়ে একটি সমন্বিত ও সহজ প্রক্রিয়া না থাকায় সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।
‘একটি দপ্তরের অনুমোদন, আরেকটির নতুন প্রশ্ন’
একজন উদ্যোক্তার ভাষায়, “একটি দপ্তরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর আরেকটি দপ্তরে যেতে হয়। সেখানে আবার নতুন কিছু কাগজ চাওয়া হয়। এভাবে একই প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করতে হচ্ছে।” তাঁর প্রশ্ন, “সরকার যদি ইকো-ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করতে চায়, তাহলে উদ্যোক্তার জন্য একটি সমন্বিত সেবা ব্যবস্থা থাকবে না কেন?” এই প্রশ্ন শুধু উদ্যোক্তার নয়। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সুন্দরবন সংরক্ষণের বৃহত্তর প্রশ্ন।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পরিবেশবিধি লঙ্ঘন কিংবা অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ ও অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন। পরিবেশের ক্ষতি হলে সেটি জনস্বার্থের বিষয়। তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কোনো প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া চলমান থাকা এবং প্রকল্পটি পুরোপুরি অবৈধ হওয়া—এই দুই বিষয়কে অনেক সময় একইভাবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কোনো রিসোর্টের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ’ শব্দটি ব্যবহারের আগে তার অনুমোদন প্রক্রিয়া, আবেদন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অবস্থান এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বাস্তব অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কারণ, কাগজপত্রের প্রশাসনিক জটিলতা যদি নীতিগত সমন্বয়হীনতার কারণে তৈরি হয়, তার দায় এককভাবে উদ্যোক্তার ওপর চাপানো কতটা যৌক্তিক—সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়। সুন্দরবন নিয়ে সংবাদ হোক আরও অনুসন্ধানী, তথ্যভিত্তিক ও গঠনমূলক। এতে যেমন পরিবেশ রক্ষা হবে, তেমনি নীতিনির্ধারকরাও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ পাবেন।
পর্যটনের সম্ভাবনা, প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও বাংলাদেশের পর্যটন খাত এখনও তার সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে। সুন্দরবন, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনসম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এবং একই সঙ্গে তৈরি করা সম্ভব বন সংরক্ষণে অর্থনৈতিক প্রণোদনা। তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজম, অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণ নয়।
কী করা যেতে পারে?
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, সুন্দরবন ও ECA এলাকায় টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রথমত, পর্যটন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে ECA এলাকায় ইকো-রিসোর্ট ও পর্যটন অবকাঠামোর জন্য সুস্পষ্ট পরিবেশগত গাইডলাইন প্রণয়ন করা।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় পর্যটন নীতিমালায় উল্লেখিত One Stop Service কার্যকর করে উদ্যোক্তাদের জন্য সমন্বিত অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা।
তৃতীয়ত, সুন্দরবন এলাকায় পর্যটন নিরাপত্তা, পরিবেশগত শর্ত, নৌযান চলাচল ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত রেগুলেটরি কাঠামো তৈরি করা।
চতুর্থত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবস্থার অংশীদার করে কর্মসংস্থান ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়ানো।
উদ্যোক্তা বনাম পরিবেশ—এটি কি সত্যিই দ্বন্দ্ব?
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে সেখানে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করাও গ্রহণযোগ্য নয়। সমাধান হতে পারে মাঝামাঝি একটি পথ—কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ডের অধীনে পরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম। যেখানে উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করবেন, সরকার সুস্পষ্ট নিয়ম ও দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, স্থানীয় মানুষ কর্মসংস্থান পাবেন এবং সুন্দরবনের পরিবেশ থাকবে সর্বোচ্চ সুরক্ষায়।
এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বক্তব্যও স্পষ্ট— “আমরা নিয়মের বাইরে যেতে চাই না। আমরা অপরাধী নই; আমরা সহযোগী হতে চাই।” এখন প্রশ্ন হলো, সুন্দরবনের ইকো-ট্যুরিজমকে কি প্রশাসনিক জটিলতার গোলকধাঁধায় আটকে রাখা হবে, নাকি পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ—এই তিনটিকে সমন্বয় করে একটি টেকসই মডেল তৈরি করা হবে? সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ শুধু বন রক্ষার প্রশ্ন নয়। এটি একই সঙ্গে পরিবেশ, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রশ্ন।
সঠিক নীতি, স্বচ্ছ নিয়ম এবং আন্তঃদাপ্তরিক সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকো-ট্যুরিজম বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। সেই সম্ভাবনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা যেন সুন্দরবন না হয়—বরং আমাদের প্রশাসনিক জটিলতাই যেন না হয়ে দাঁড়ায়।


