জাকারিয়া হোসাইন শাওন :: ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। ১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার উদ্যোগে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পর্যটনের গুরুত্ব তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি এবং পর্যটনকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য “Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism”, বাংলায় যার অর্থ “পর্যটন পুনর্গঠনে ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা”। সময়ের সঙ্গে পর্যটন খাতও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটকের অভিজ্ঞতা আরও সহজ, নিরাপদ, আধুনিক ও টেকসই করার ওপর এবারের প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বাগেরহাটেও রয়েছে নানা আয়োজন। বাগেরহাট পর্যটন ফোরামের উদ্যোগে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার সকাল ১০টায় ষাটগম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণে শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় ষাটগম্বুজ মসজিদ চত্বরে সমাবেশ ও সাইকেল র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। বাগেরহাটের পর্যটনপ্রেমী, তরুণ সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষকে এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাগেরহাট বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন জেলা। ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয় এই জেলাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। একদিকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য ঐতিহাসিক মসজিদ নগরী বাগেরহাট, অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। একই জেলার মধ্যে দুটি বিশ্ব ঐতিহ্যের উপস্থিতি বাগেরহাটের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
ষাটগম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর মাজার, খাঞ্জেলী দীঘি, নয়গম্বুজ মসজিদ, সিংগাইর মসজিদ, কোদলা মঠসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা বাগেরহাটের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। অন্যদিকে সুন্দরবন তার অনন্য জীববৈচিত্র্য, নদী-খাল, ম্যানগ্রোভ বন এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে আসছে।
একজন পর্যটক একই সফরে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের ইতিহাস এবং সুন্দরবনের বন্য প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নিতে পারেন বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এটি বাগেরহাটের একটি বড় শক্তি।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাগেরহাটে যাতায়াত আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। এর ফলে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাগেরহাটকে শুধু এক দিনের ভ্রমণ গন্তব্য না করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন ডেস্টিনেশন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা, স্থানীয় পরিবহন, প্রশিক্ষিত গাইড, মানসম্মত খাবার, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যাপ্ত পর্যটন তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বদলে যেতে পারে পর্যটন
বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের সামনে নতুন একটি সম্ভাবনার কথা বলছে। বাগেরহাটের পর্যটনকেও এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার সময় এসেছে। ষাটগম্বুজ মসজিদসহ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে QR Code-ভিত্তিক তথ্যসেবা, ডিজিটাল অডিও গাইড, ভার্চুয়াল ট্যুর ও বহুভাষিক তথ্যব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। পর্যটকরা একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র, যাতায়াত, আবাসন, গাইড, খাবার ও অন্যান্য সেবার তথ্য এক জায়গা থেকে পেতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে পর্যটকের সময়, বাজেট ও আগ্রহ অনুযায়ী ব্যক্তিগতকৃত ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে পর্যটকদের বিভিন্ন ভাষায় তথ্য প্রদান, রুট নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সেবা সম্পর্কেও তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা, মৌসুমভিত্তিক চাপ, নৌযান চলাচল ও পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে ডাটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে আরও কার্যকর ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু পর্যটক বাড়ানোর জন্য নয়; প্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্যও হতে হবে।
স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করতেই হবে
পর্যটন উন্নয়নের সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় হস্তশিল্প, মধু, গোলপাতার গুড়, স্থানীয় খাবার, নৌযাত্রা, গাইড সার্ভিস, হোমস্টে এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।
এতে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষের আগ্রহ বাড়বে।
তবে পর্যটন উন্নয়নের পথে এখনও নানা সমস্যা রয়েছে। অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহার এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি বন্ধেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে বাগেরহাটের পর্যটন সম্ভাবনা বিশাল। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। একটি সমন্বিত বাগেরহাট পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান, আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ আমাদের সেই সুযোগের কথাই মনে করিয়ে দেয়। বাগেরহাটের অতীত আমাদের গর্ব, আর আধুনিক প্রযুক্তি হতে পারে তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার।
বাগেরহাটের ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে, প্রকৃতি আছে এখন প্রয়োজন প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে আমাদের প্রত্যাশা বাগেরহাট হোক একটি স্মার্ট, টেকসই ও বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্য; যেখানে প্রযুক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যাবে ইতিহাস, প্রকৃতি, মানুষ ও স্থানীয় অর্থনীতি।
লেখকঃ জাকারিয়া হোসাইন শাওন, তরুণ উদ্যোক্তা


