
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়। দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে আমদানি পণ্য নিতে ট্রাকভাড়া বেড়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্যের দাম নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই বাড়তি ভাড়া নিয়ে ট্রাকচালক, পরিবহন মালিক ও আমদানিকারকদের মধ্যে বেনাপোল বন্দরে আলোচনা ও বাকবিতণ্ডা চলছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যায়। এ ছাড়া রপ্তানি পণ্য নিয়ে বন্দর ছাড়ে আরও শতাধিক ট্রাক।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকভাড়াও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবসায়ীরা বাড়তি চাপের মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, বেনাপোল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পাঠানোর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন।
এর আগে রোববার রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেনাপোলের পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, গন্তব্যভেদে ট্রাকভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি, ফেরি ও অন্যান্য পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের মোট খরচও বাড়ছে।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ টন পণ্য বেনাপোল থেকে ঢাকায় নিতে রোববার পর্যন্ত ট্রাকভাড়া ছিল ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা। এখন একই পণ্যের জন্য ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম রুটে আগে ট্রাকভাড়া ছিল ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। বেনাপোল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে আগে ভাড়া ছিল ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা। এখন চাওয়া হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা।
বেনাপোল থেকে পণ্য নিতে আসা ট্রাকচালক আরিফুল ইসলাম বলেন, ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় ট্রিপপ্রতি ট্রাকভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়াতে হচ্ছে। জ্বালানির বাড়তি খরচের কারণে তাদেরও ভাড়া সমন্বয় করতে হচ্ছে।
আরেক চালক শাহিন আলম বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় ট্রাকভাড়া নির্ধারণ করতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তার আশঙ্কা, পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্যের দামেও পড়বে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মহসিন মিলন বলেন, পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি পরিবহন খরচ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও আমদানিকৃত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বাণিজ্য কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি আতিকুজ্জামান সনি বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি অনেক পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিবহন খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে ট্রাকভাড়া সমন্বয় করাটাই স্বাভাবিক।
তিনি জানান, অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের বার্ষিক চুক্তি রয়েছে। ফলে হঠাৎ জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির নির্ধারিত ভাড়ায় পণ্য পরিবহন করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। জ্বালানির পাশাপাশি টায়ার, ট্রাকের যন্ত্রাংশ ও ফেরি ভাড়ার ব্যয়ও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন সংকটের কারণে ট্রাকভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় পণ্য আমদানি করলেও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পচনশীল পণ্য দ্রুত খালাস করতে অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিচ্ছেন। তেলের দাম, ফেরি ভাড়া ও ট্রাকের সংকট—সব মিলিয়েই পরিবহন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পর ফেরার পথে অনেক সময় ট্রাকের ভাড়া না পাওয়ায় একমুখী যাত্রার বাড়তি খরচও মূল ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করছেন পরিবহন মালিকরা।


