জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় কাছ থেকে গুলি করে শহীদ ইমাম হাসান তাইমকে হত্যা করে তৎকালীন পুলিশের সদস্যরা। আলোড়ন তোলা সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিয়েছেন তাইমের বাবা পুলিশ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ময়নাল হোসেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে বুধবার (১৫ এপ্রিল) জবানবন্দিতে পুলিশের এসআই ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার ছেলে (তাইম) দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে, এসআই সাজ্জাদ গুলি করে। আমার ছেলে মা মা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার বন্ধু রাহাত তাইমকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ জবানবন্দি দেওয়ার সময় নিজের সন্তানের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পুলিশ কর্মকর্তা ময়নাল হোসেন। তিনি বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কর্মরত আছেন। ছেলের বন্ধুদের কাছ থেকে সন্তানের শেষ মুহূর্তের ঘটনা শুনেছেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে ময়নাল হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল।
সে সময় তাইম ও তার বন্ধু শাহরিয়ার, রাহাত যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় লিটনের চায়ের দোকানের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করছিল। ২০–২৫ জন পুলিশ তার ছেলে ও তার বন্ধুদের চতুর্দিক দিয়ে ধাওয়া করে। কোনো দিকে যেতে না পেরে তার ছেলে ও তার বন্ধুরা লিটনের চায়ের দোকানে প্রবেশ করে এবং দোকানের শাটার টেনে নিচে নামায় পুলিশ সদস্যরা দোকানের শাটার খুলে তার ছেলে ও তার বন্ধুদের বের করে লাঠি, রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারতে থাকে। অশ্রুসিক্ত ময়নাল হোসেন বলেন, পরে পুলিশ সদস্যরা তার ছেলে ও তার বন্ধুদের দৌড় দিয়ে চলে যেতে বলে। তার ছেলে দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং এসআই সাজ্জাদ গুলি করে। তার ছেলে মা মা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার বন্ধু রাহাত তাকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে। একটি গুলি রাহাতেরও পায়ে লাগে এবং জীবন বাঁচাতে সে তার ছেলেকে ফেলে চলে যায়। খবর পেয়ে সেদিন বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান জানিয়ে সন্তান হারা এই পুলিশ বাবা বলেন, হাসপাতালের মর্গে প্রবেশ করে তিনি তার ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখতে পান। ছেলের লাশের ওপরের দিকে, বুকে, পেটে এবং পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পান তিনি। তখন তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেছিলেন, একটা মানুষ মারতে কয়টি গুলি লাগে? পরে ছেলের লাশ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে গোসল করানোর কথা উল্লেখ করে জবানবন্দিতে ময়নাল হোসেন বলেন, গোসলের সময় ছেলের লাশের কোমরের বাঁ পাশে বড় একটি গর্তের দাগ দেখা যায়। তিনি ও তার সহকর্মীরা এই দাগ দেখে বুঝতে পারেন, এটা পিস্তলের গুলির দাগ।
পুলিশের গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে গুলির তথ্য গোপন করার অভিযোগ তোলেন তার বাবা পুলিশের এসআই ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী শাহবাগ থানার এসআই শাহদাতের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে ময়নাল হোসেন বলেন, এসআই শাহদাত সুরতহাল করার সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলি না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন? এসআই শাহদাত আমাকে বলল-এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় মোট ১১ জন আসামি। যার মধ্যে ৯ জন পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন- ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক ও সাবেক এসআই সাজ্জাদ উজজামান। কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী। বুধবার এই দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।


