
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের জামায়াত মনোনীত ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরে যারা বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে, তারা সুশাসন, সততা ও নৈতিকতার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, “দেশের মানুষ এবার একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়। এই পরিবর্তনের অর্থ হলো-যারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।”
গোলাম পরোয়ার অভিযোগ করেন, অতীতে ক্ষমতায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে এবং ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। তিনি বলেন, “বারবার যারা পরীক্ষায় ফেল করে, তাদের আবার সুযোগ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।” সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খানজান আলী থানার উদ্যোগে খানজাহান আলী থানাধীন শিরোমনি কেডি এ মার্কেট চত্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন।
খানজাহান আলী থানা জামায়াতের আমীর সৈয়দ হাসান মাহমুদ টিটোর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন, ডাকসু জি এস এস এম ফরহাদ, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু ও খুলনা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন খুলনা জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, অধ্যক্ষ গাওসুল আযম হাদী, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ আমিনুল ইসলাম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া মিন্টু, ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি হরিদাস মন্ডল, শ্রমিক নেতা খান গোলাম রসুল, উত্তর জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ ফকির, ফুলতলা উপজেলা খেলাফত মজলিসের সভাপতি আব্দুল জালাল সরদার, জেলা খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ মো. ওমর ফারুক, বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা মো. মোজাম্মেল হক, ইউপি সদস্য হাফেজ গোলাম মোস্তফা, হাফেজ মাওলানা মফিজুল ইসলাম প্রমুখ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে এমপি ও মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন না এবং সরকার হবে জনগণের সেবক। তিনি আরও বলেন, “আমরা ক্ষমতায় গেলে শাসক নয়, জনগণের খাদেম হিসেবে কাজ করব।”
নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে গোলাম পরোয়ার বলেন, অতীতে তিনি সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছেন। আবার নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা নিরসন, ব্রিজ নির্মাণ, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং হাসপাতাল উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে। অতীতে মন্দির নির্মাণ ও ধর্মীয় উৎসবে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ডুমুরিয়াুফুলতলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ।”
জনসভায় ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে জনগণ একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়বে।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, নির্বাচন শুরু হয়েছে ডাকসু দিয়ে। আপনারা দেখেছেন ডাকসুর নির্বাচন? যে সকল কার্ড ডাকসু নির্বাচনে খেলা হচ্ছে, সে সকল কার্ড মোটামুটি ডাকসু নির্বাচন শেষ। তারা বলেছিল নারী নাকি ভোট দেবে না। ডাকসু দেখছেন না কত ভোট দিয়েছে! এবার সেই খেলা দেখবেন। আমাদের ডাকসু তারা ডাকসু দিয়ে করার জন্য নানা উপায় চেষ্টা করেছে, কিন্তু তারা পারে নাই।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ডাকসু ভোট কেন্দ্রের চারশ’ গজের মধ্যে নাকি মোবাইল নিয়ে ঢোকা যাবে না। আমরা আজকে ঘোষণা দিয়েছি, যদি আজকের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা না হয়, আগামীকাল নির্বাচন কমিশন ঘেরাও হবে। আমরা সিদ্ধান্ত মানি না। আমরা তরুণ না, যারা ২৪ এনে দিয়েছি, রক্তের মধ্য দিয়ে জীবনের বিনিময়ে। আমরা তরুণরা জীবনের প্রথম ভোট হাসতে হাসতে যেয়ে দিবো, ভিডিও করবো, সেলফি তুলবো, মোবাইল নিয়ে যাবো, কেউ লুটপাট করলে তারে ফিরাবো ইনশাআল্লাহ। তাই না?
তারা চেয়েছিল মোবাইল বন্ধ করবে আর তারা ব্যালট বক্স চিন্তা করবে, বাটপারি করবে, অস্ত্র নিয়ে ঢুকবে, আর কেউ ভিডিও করতে পারবে না, এই অবস্থা তারা করতে চেয়েছিল। আমরা কি করতে দিবো? না। আমরা ওদের ঘোষণা দিয়েছি। ডাকসু থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, আজকের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। না হলে ছাত্র জনতা আগামীকাল থেকে আবার মাঠে নামবে। ঠিক। আজকের মধ্যে যদি সিদ্ধান্ত বাতিল না হয়, কালকে ইলেকশন কমিশন ঘেরাও করা হবে। সুতরাং, এই চালটা আর চলবে না ইনশাআল্লাহ।
সম্মানিত বন্ধুগণ, আপনাদের এলাকায় টাকা দিয়ে কি ভোট কেনা হয়? টাকা দেয় না অন্য প্রার্থী? জায়গা জায়গা টাকা দেয়, লুটপাট করে টাকা। আমি দেখলাম বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে অলমোস্ট ৬০% প্রার্থী হচ্ছে ঋণখেলাপি । তার মানে হলো তারা ঋণখেলাপি, তারা এমপি হলে ব্যাংক লুটপাট করবে। আপনার আমার কষ্টে উপার্জিত টাকা যদি ব্যাংকে রাখলে, তারা লুটপাট করে চলে যাবে।
কিন্তু জনগণ জায়গা মতো ভোট দেবে। যতই খাওয়ান, ভোট কিন্তু আর কেউ দিবে না। মিষ্টি মিষ্টি হাসবে আর খাবে। পিছনে এসে বলবে জায়গা মতো ভোট দিবো। আমরা আশা করেছিলাম এবার বোধহয় মারামারি দেখবো না। পরে হিসাব করে দেখলাম, পুরো বাংলাদেশে যত মারামারি হইছে, তার মধ্যে ৯০ ভাগের বেশি মারামারি তারা করছে। ব্যবসায়ীদের দোকানে চাঁদা, হুমকি খবর বাইরে গেলে মাইরা ফেলবে। ঢাকায় প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা করছে। এবার একটা ঐতিহাসিক সময়। যদি ভুল করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়ী থাকবো। যারা জুলাইয়ে গুলির মুখে জীবন দিয়েছে, তারা ১২ তারিখে ভোট দেবে ইনশাআল্লাহ। আমরা ভেবেছিলাম পরিবর্তন হবে। কিন্তু যেই লাউ ছিল, সেই কদু। কোন পরিবর্তন হয় নাই। আমরা এবার কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত নিব।
নাম্বার ওয়ান সিদ্ধান্ত আমরা হ্যাঁ তে ভোট দিব। এই হ্যাঁ ভোটে তারেক রহমান ভয় পায়। আমরা হ্যাঁ দিয়ে দেখাবো।
হিন্দু ভাই, বৃদ্ধ, নারী, যুবক সবাইয়ের প্রতি দায়িত্ব। প্রত্যেকে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিবেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাইকে বলবেন ভুল করা যাবে না। তৃতীয ভোট কেন্দ্রে যদি ঠেকাতে চায়, লুটপাট করতে চায়, আমরা রুখে দাঁড়াবো।
আমরা দুইটা ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছি। একটা আমার টাকা, আমার হিসাব। মোবাইলে অ্যাপ থাকবে, কোন ব্রিজের বাজেট কত, কোন স্কুলের বাজেট কত সব হিসাব পাবেন। এমপি-চেয়ারম্যান বাটপারি করতে পারবে না।
দ্বিতীয় ডিজিটাল পাওয়ার। মোবাইলে অন্যায়, চাঁদাবাজি, অপরাধের তথ্য গোপনে জমা দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা হবে। সুতরাং, লুটপাটের দিন শেষ। চাঁদাবাজির দিন শেষ। ১২ তারিখে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে গণজোয়ার শুরু হয়েছে, সেই গণজোয়ার তাদের পরাজিত করবে ইনশাআল্লাহ।
এনসিপি-র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ডাঃ মাহমুদা মিতু বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু ক্ষমতার অভিজ্ঞতা নয়, নৈতিক চরিত্র ও জনগণের সমস্যা বোঝার যোগ্যতাও জরুরি। তিনি বলেন, “দিনাজপুরে তারেক রহমান ‘ম্যাংগো, ম্যাংগো’ বলেছেন, অথচ সেখানে লিচু উৎপাদন হয়—এটি প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা না বুঝেই রাজনীতি করা হচ্ছে, যা হাস্যকর।”
নারীদের প্রতি সহিংসতা ও ভীতি সৃষ্টির ঘটনায় কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “পটুয়াখালীতে গর্ভবতী নারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। যারা নারীদের ওপর অশুভ আচরণ করে, তারা রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য নয়।” তিনি আরও বলেন, চরিত্রহীন শক্তি নারীর সম্মানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। “আমরা শক্তি দেখাবো, নারীরা আমাদের পাশে থাকবে,”।
ডা. মাহমুদা মিতু ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভোট বিক্রি মানে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ বিক্রি করা। যারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ভোট জালিয়াতিতে জড়াবে, তাদের লাল কার্ড দেখাতে হবে।” তিনি ভোটারদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দলটি ক্ষমতায় এলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও যুবসংস্থানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিশ্চিত করা হবে উল্লেখ করে তিনি বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি দেন। ডুমুরিয়াুফুলতলাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
সমাবেশে ভোটের দিন নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে ডা. মিতু বলেন, “ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা পাহারা দেব। আমাদের ভাইয়েরা ভোটকেন্দ্রে থাকবে, কেউ ভোট দখল করতে পারবে না।”
জাতীয় প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে দেশের নেতৃত্ব বারবার দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় ও অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। “এখন প্রয়োজন নতুন নেতৃত্ব—যারা নৈতিক, সৎ এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করবে। যারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে, তাদের আর সুযোগ দেওয়া যাবে না,” বলেন তিনি।


