
দেশের প্রতিটি শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো প্রতিভা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তাদের সেই প্রতিভা বিকাশে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, সংগীত ও বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, “প্রতিটি শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। আমাদের দরকার শুধু তাকে সেই সুযোগটি করে দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজেকে বিকশিত করতে পারে।”
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুরা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠলে পরিবারের পাশাপাশি দেশের ভিত্তিও শক্তিশালী হবে। প্রতিটি শিশুকে নিজের প্রতিভা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু লেখাপড়ায় ভালো করলেই হবে না; খেলাধুলা, শিল্প, সংস্কৃতি ও সংগীতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, কোনো শিশু ছবি আঁকতে, কবিতা আবৃত্তি করতে, গান গাইতে কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করে। কেউ আবার নাচ বা কোরআন তেলাওয়াতে আগ্রহী। শিশুদের নিজস্ব পছন্দ ও আগ্রহ অনুযায়ী এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের অংশগ্রহণে দেশব্যাপী ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রথমবারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের প্রায় ২২ লাখ শিশু অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে।
এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখা গেলে অংশগ্রহণকারী শিশুদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেই উদ্যোগের পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলার বিকাশেও নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি শিশু যেন শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলাধুলার অন্তত একটি ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়, সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরাও যাতে এসব সুবিধা পায়, সে জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই আর্ট, কালচার, স্পোর্টস ও মিউজিকের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তারেক রহমান জানান, এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০২৭ অথবা ২০২৮ সাল থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। শিশুদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গান, বাদ্যযন্ত্র কিংবা বিভিন্ন খেলাধুলার একটি ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় শিশুদের বিদেশি ভাষা শেখার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান ও জাপানিসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তৃতীয় একটি ভাষা জানা শিশুদের বাড়তি সক্ষমতা দেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এটি তাদের সহায়তা করবে।
শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পড়াশোনা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি বা একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করলেই একজন মানুষ সম্পূর্ণ হয় না। তাকে প্রকৃতি ও জীবজগতের প্রতিও মানবিক হতে হবে।
তিনি বলেন, “এই দেশের প্রকৃতি, পশুপাখির প্রতিও তোমাদের মানবিক হতে হবে।” গাছপালা ও পশুপাখির যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে মানুষ শুধু মানুষের প্রতিই নয়, প্রকৃতি ও প্রকৃতির সৃষ্টির প্রতিও সদয় হবে। একটি গাছকে শিশুর মতো যত্ন করে বড় করার পাশাপাশি আশপাশের পশুপাখির প্রতিও সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়েও শিশুদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার পাশাপাশি কেউ এমনটি করলে তাকে বিনয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার অনুরোধ করতে শিশুদের আহ্বান জানান তিনি।
অভিভাবকদের প্রতি সন্তানদের মধ্যে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশকে গড়ে তোলার দায়িত্ব সবার। ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে গেলে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, মানবিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। পরে পরিবেশনায় অংশ নেওয়া শিশুদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও ফটোসেশনে অংশ নেন এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর শিশুদের আঁকা ছবি ও ফটো গ্যালারি পরিদর্শন করেন তিনি।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শিশু জাদুঘর ভবনে যান। সেখানে ভবনের নিচতলায় সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশন উদ্বোধন করেন তিনি।
এর আগে সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে পৌঁছালে ১৫০ শিশু প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। পরে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।


