সব কিছু
facebook channelkhulna.tv
খুলনা , ,
আগুনের ভেতর মায়েদের লড়াই, বোর্নিওর বন বাঁচাচ্ছে ১৪৬ নারী | চ্যানেল খুলনা

আগুনের ভেতর মায়েদের লড়াই, বোর্নিওর বন বাঁচাচ্ছে ১৪৬ নারী

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। সুংগাই পুত্রি গ্রামের এক বাড়িতে দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইরমা। ৩৯ বছর বয়সী এই গৃহিণীর দিনের কাজ অন্য অনেক মায়ের মতোই শুরু হওয়ার কথা ছিল সংসার সামলানো দিয়ে। কিন্তু আগুনের মৌসুমে তার আরেকটি পরিচয় সামনে আসে—তিনি একজন স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক।

ভারী রাবারের বুট পায়ে দেন ইরমা। শরীরে জড়ান নিরাপত্তা সরঞ্জাম। এরপর মোটরসাইকেলে চড়ে রওনা দেন গ্রামের আগুনপ্রবণ এলাকার দিকে। চারপাশে তখন ধোঁয়া, বাতাসে পোড়া গন্ধ আর বিষাক্ত কণার ঝুঁকি।

ইরমা একা নন। তার সঙ্গে আছেন আরও ১৪৫ নারী। তারা সবাই ‘পাওয়ার অব মামা’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী দলের সদস্য। ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলকে আগুনের হাত থেকে রক্ষায় কাজ করছেন তারা।

‘আমরা গৃহিণী। তাই এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি আমাদের ওপরই পড়ে। আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে আমাকে কিছু একটা করতেই হবে।’

ইরমার কথায় লুকিয়ে আছে এই লড়াইয়ের গল্প।

সংসার থেকে আগুনের মাঠে

পশ্চিম কালিমান্তানের ১০টি গ্রামের ২০ থেকে ৫৮ বছর বয়সী ১৪৬ নারীকে নিয়ে ২০২২ সালে গড়ে ওঠে ‘পাওয়ার অব মামা’। বেসরকারি সংস্থা ওয়াইআইএআরআইয়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই দলের সদস্যদের দেওয়া হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ।

অগ্নিনির্বাপণ থেকে শুরু করে নজরদারি ড্রোন পরিচালনা, আগুনের অবস্থান শনাক্ত করা এবং স্থানীয় মানুষকে সচেতন করা—সবই শিখেছেন তারা।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল দেন দলের সদস্যরা। বন ও বাগানের সীমানা ঘুরে দেখেন। কোথাও আগুনের সূত্রপাত হলে তার অবস্থান শনাক্ত করেন, ছবি তোলেন এবং স্থানটির সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেন।

পরে এসব তথ্য বিশেষ একটি মনিটরিং অ্যাপে যুক্ত করা হয় এবং বন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিশেষায়িত অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী ‘মাঙ্গালা আগনি’কে জানানো হয়।

কখনো তাদের যেতে হয় ধোঁয়ায় ঢেকে থাকা এলাকায়, কখনো শুকিয়ে যাওয়া নদী বা খালের পাশে। কখনো আবার আগুনের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নজর রাখতে হয়, যাতে তা বসতিতে ছড়িয়ে না পড়ে।

নারীরা কি সত্যিই টহল দিতে পারে?’

শুরুটা সহজ ছিল না।

গ্রামের অনেক পুরুষ প্রথমদিকে তাদের নিয়ে ঠাট্টা করতেন। প্রশ্ন তুলতেন, নারীদের আবার টহল দেওয়ার কী দরকার? সংসার সামলানোই কি তাদের কাজ নয়?

ইরমা সেই দিনগুলোর কথা মনে করে বলেন, গ্রামের পুরুষেরা তাদের বলতেন, ‘নারীরা কি সত্যিই টহল দিতে পারে? নারীদের আবার টহল দেওয়ার কী দরকার? তোমাদের কি অন্য কোনো কাজ নেই?’

সময় অবশ্য অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।

এখন সেই নারীরাই আগুনের খবর দেন, স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করেন এবং প্রয়োজনে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেন। তাদের কাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন উপলব্ধি।

তবে সামাজিক বাধা পুরোপুরি দূর হয়নি।

দলের সদস্য সুরিয়াতি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের প্রতিক্রিয়া। কখনো তারা মনে করে আমরা নিজেদের দেখানোর জন্য এসব করছি। তারা বলে, “মায়েরা এসব কী বোঝে?”’

বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের বোঝাতে তাদের আরও ধৈর্য ধরতে হয়।

‘আমরা যখন তাদের অসতর্কভাবে জমিতে আগুন না দিতে বলি, তখন অনেকে জেদ ধরে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে আমাদের খুব সতর্ক ও নম্রভাবে বোঝাতে হয়।’

আগুন নয়, বোঝানোর লড়াইও

ইন্দোনেশিয়ায় জমি পরিষ্কার করতে আগুন ব্যবহার নতুন কোনো ঘটনা নয়। তেলাপামসহ বিভিন্ন ফসল চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করতে অনেকেই আগুন ব্যবহার করেন। এটি তুলনামূলক সস্তা ও সহজ পদ্ধতি হলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে বন, কৃষিজমি এমনকি বসতিতেও।

তাই ‘পাওয়ার অব মামা’র কাজ শুধু আগুন নেভানো নয়। তাদের বড় একটি দায়িত্ব মানুষকে আগুনের ঝুঁকি সম্পর্কে বোঝানো।

২০২৩ সালে দলে যোগ দেওয়া রাতিনাহ বলেন, কেউ জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ব্যবহার করলে তারা তাকে সরাসরি বাধা দেওয়ার বদলে ঝুঁকিগুলো বোঝানোর চেষ্টা করেন।

‘আমরা বলি, জমি পরিষ্কার করতে আমরা আপনাদের বাধা দিচ্ছি না। তবে আগুনটা কি একটু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, যাতে এটি ছড়িয়ে না পড়ে? আমরা তাদের বোঝাই, ধোঁয়া কীভাবে তাদের সন্তান ও পরিবারের ক্ষতি করতে পারে।’

এই বোঝানোর কাজ কখনো কখনো আগুন নেভানোর চেয়েও কঠিন হয়ে ওঠে।

পুড়ছে হাজার হাজার হেক্টর জমি

চলতি বছর পরিস্থিতি আরও কঠিন। সংবাদমাধ্যম হারিয়ান কমপাসের তথ্য অনুযায়ী, কালিমান্তানে হাজার হাজার হটস্পটে আগুন লেগে এখন পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৮১ দশমিক ৩৩ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পিটভূমিতে। এসব এলাকায় আগুন শুধু মাটির ওপর জ্বলে না; মাটির নিচেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আগুনের শিখা দেখা না গেলেও ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকে।

ওয়াইআইএআরআইয়ের পরিচালক কারমেলে ইয়ানো সানচেজ বলেন, ‘পিটভূমির আগুন নেভানো খুব কঠিন, কারণ আগুন মাটির নিচে থাকে। আগুনের শিখা দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে জ্বলতে থাকে। অনেক সময় সামান্য বাতাসই আগুনকে আবার জ্বালিয়ে দিতে যথেষ্ট।’

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার ঝুঁকি। এ বছর ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতি আগুনের প্রবণতা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থ অবজারভেশন কর্মসূচি কোপার্নিকাসের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মার্ক পারিংটনও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। তার মতে, ইন্দোনেশিয়ায় মৌসুমি আগুন থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং আঞ্চলিক বায়ুদূষণ ইতোমধ্যে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি।

নদী শুকিয়ে গেছে, তবু পাহারায় মায়েরা

সুংগাই পুত্রিতে জুনের শেষ দিক থেকে বৃষ্টি হয়নি বলে জানান ইরমা। এরই মধ্যে পানির সংকটও তীব্র হয়েছে।

‘ছোট ছোট খাল, এমনকি নদীগুলোও শুকিয়ে গেছে। ফলে আগুন নেভানো আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তবু তারা থামছেন না।

ইরমা বলেন, ‘আমাদের একমাত্র উপায় হলো স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে বাগান বা বনের প্রান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা।’ তার কণ্ঠে ভয়ও আছে।

‘আমি আতঙ্কিত থাকি, আগুন যদি বসতিপূর্ণ এলাকায় পৌঁছে যায়। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।’

২০১৯-এর আগুন যে জীবন বদলে দিয়েছিল

‘পাওয়ার অব মামা’র আরেক সদস্য ৪৬ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষিকা এরলি মার্লিনা। ২০১৯ সালের ভয়াবহ আগুন দেখার পরই তিনি এই দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তার কাছে এটি শুধু একটি স্বেচ্ছাসেবী কাজ নয়। পরিবেশের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা প্রকাশেরও একটি পথ।

‘পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আমার ভালোবাসা প্রকাশ করার এবং মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাজ করার একটি সুযোগ হিসেবে আমি এই দলে যোগ দিয়েছি।’

২০১৯ সালের একটি রাতের অভিযানের কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে এরলির।

আগুনের মাত্র ১০০ মিটার দূরে ছিল কয়েকটি বাড়ি। এশার নামাজের পর আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন তারা। টানা চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টার পর রাত ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

এরলি বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে আমরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকি। স্থানীয় বাসিন্দারা সত্যিই এই দলের ওপর নির্ভর করেন।’

বন রক্ষার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে নারীদের জীবনও

‘পাওয়ার অব মামা’র কাজ শুধু আগুনের বিস্তার ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই কাজের মধ্য দিয়ে বদলে যাচ্ছে দলের নারীদের নিজেদের দেখার দৃষ্টিও।

২০২৩ সালে দলটি ‘ইন্দোনেশিয়ান ক্লিন এয়ার চ্যাম্পিয়নশিপ’ পুরস্কার অর্জন করেছে। তবে দলের কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো মানুষের আস্থা পাওয়া এবং নিজেদের সক্ষমতার জায়গাটি তৈরি করা।

ওয়াইআইএআরআইয়ের পরিচালক সানচেজের কথায়, ‘বন রক্ষা করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এটি শুধু আগুন নেভানোর বিষয় নয়। এর মাধ্যমে নারীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন এবং সমাজে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করছেন।’

বোর্নিওর বন যখন আগুনে পুড়ছে, তখন সেই আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ইরমা, সুরিয়াতি, রাতিনাহ, এরলির মতো নারীরা।

তাদের হাতে শুধু আগুন নেভানোর সরঞ্জাম নয়; আছে একটি বন, একটি জনপদ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ রেখে যাওয়ার প্রত্যয়।

https://www.channelkhulna.tv/wp-content/uploads/2021/09/add-space-ck.gif

Featured আরও সংবাদ

ডোপামিন ফুড: খাবারেই মিলবে ভালো থাকার চাবিকাঠি

হাওড়ে ‘জলনিবাস’

ডুমুরিয়ায় পেয়ারা পাতা দিয়ে বানানো চায়ের গুরুত্ব যে অনেকাংশেই বৃদ্ধি পয়েছে

শুভ জন্মদিন প্রকৃতি সৈকত

ইলেক্টোরাল ভোটেও বাইডেনের জয়

সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

চ্যানেল খুলনা মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
সম্পাদক: মো. হাসানুর রহমান তানজির
It’s An Sister Concern of Channel Khulna Media
© ২০১৮ - ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | চ্যানেল খুলনা.বাংলা, channelkhulna.com.bd, channelkhulna.com, channelkhulna.bd
যোগাযোগঃ ৫ কেডিএ বানিজ্যিক এলাকা, আপার যশোর রোড, খুলনা।
প্রধান কার্যালয়ঃ ৫২/১, রোড- ২১৭, খালিশপুর, খুলনা।
ফোন- 09696-408030, 01704-408030, ই-মেইল: channelkhulnatv@gmail.com
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদফতরে অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।