তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামীকাল সোমবার সুন্দরবন মৎস্যজীবী, বনজীবী ও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। এ দিন সকাল থেকে সুন্দরবনে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন মৎস্যজীবী ও বনজীবীরা। এ ছাড়া দেশি ও বিদেশি পর্যটকেরাও যেন স্বাচ্ছন্দ্যে সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারেন, সে জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগ।
এর মধ্যে ১১টি পর্যটনকেন্দ্র ও অভয়ারণ্য এলাকাগুলোয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বন বিভাগ। তিন মাস পর সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারার খবরে উচ্ছ্বসিত মৎস্যজীবী ও বনজীবীরা।
জানা গেছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্য প্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় জুন থেকে আগস্টের শেষপর্যন্ত সুন্দরবনে জেলে ও পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখে বন বিভাগ। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে ওই কার্যক্রম চলছে। তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর আবার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আজ রোববার দিবাগত রাত ১২টার পর এ নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, পর্যটক ও জেলেদের নিরাপত্তায় সুন্দরবনের প্রতিটি ক্যাম্প সতর্ক রয়েছে। এ ছাড়া ইকো ট্যুরিজম স্পটগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে।
হাছানুর রহমান আরও বলেন, পর্যটকেরা বনে যাওয়ার সময় যেন প্লাস্টিকের পানির বোতল, একবার ব্যবহার হয়—এমন প্লাস্টিকের খাবারের পাত্র, কোমলপানীয় বহনের বোতল ও ক্যান নিয়ে যেতে না পারেন, সেদিকে নজর রাখা হবে। প্লাস্টিক বন্ধে এবার কঠোর অবস্থানে সুন্দরবন বন বিভাগ। বনের ভেতরে পানি ও স্থলভাগে যাতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, পলিথিন ও অপচনশীল দ্রব ফেলতে না পারেন, সে জন্য সুন্দরবনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও যদি কেউ প্লাস্টিকের এসব সামগ্রী বনের মধ্যে নিয়ে যান, তাহলে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে। এমনকি জরিমানাও করা হবে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আযম ডেভিড বলেন, ‘১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন খুলে দেওয়া হলেও তাতে পর্যটন ব্যবসায়ীদের তেমন একটি লাভ হবে না। কারণ, এখন পর্যটনের মৌসুম নয়। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটনের মৌসুম। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনে ৭০টি ট্যুরিস্ট লঞ্চ ও জাহাজ রয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য এ পর্যন্ত পাঁচটি লঞ্চ ট্যুরিস্টরা বুকিং দিয়ে রেখেছেন। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন চার-পাঁচটি ট্যুরিস্ট লঞ্চ যাতায়াত করবে। এরপর ভ্রমণের মৌসুম পুরোপুরি শুরু হবে।’
এদিকে আজ সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের সামনে বনজীবী জেলেদের নৌকাগুলো বেঁধে রাখা। আনুষ্ঠানিকভাবে বনজীবীদের হাতে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের অনুমতিপত্র (পাস) দেওয়া হচ্ছে। জেলেরা কেউ মাছ ধরার জাল টেনে নৌকায় তুলছেন। নৌকার সামনের অংশে বরফ আর প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই রেখে তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুন্দরবন যাত্রার। কেউ অনুমতিপত্র (পাস) না পেয়ে বন বিভাগের কার্যালয়ের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছেন।
এ সময় শরণখোলার পানিরঘাট এলাকার জেলে রুস্তম বয়াতী, বগী গ্রামের জেলে রিয়াদুল, রাজাপুর গ্রামের রফিকুলসহ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, গত তিন মাস মাছ ধরতে না পেরে অর্থকষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে তাঁদের দিন কেটেছে। সংসার চালাতে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন সুন্দরবনে যাওয়ার লক্ষ্যে নৌকা ও ট্রলারে জাল ও খাদ্যসামগ্রী বোঝাইসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সময়ের অপেক্ষা করছেন বলে তাঁরা জানান।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান বলেন, পর্যটকদের বরণ করে নেওয়ার জন কটকা পর্যটনকেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিন মাস পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় কটকা অভয়ারণ্যে হরিণ, বানরসহ বন্য প্রাণীর আনাগোনা বেড়েছে।
পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে মৎস্যজীবী, বনজীবী ও পর্যটকেরা সুন্দরবনে যেতে পারবেন। পর্যটকদের বরণ করে নিতে সুন্দরবন বিভাগ প্রস্তুত রয়েছে।
রেজাউল করীম চৌধুরী আরও বলেন, তিন মাস মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় বেকার জেলেদের খাদ্যসহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো জেলেদের একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট মৎস্য দপ্তর যাচাই-বাছাই করেছে। আগামী বছর থেকে জেলেরা মৎস্য বিভাগ থেকে খাদ্যসহায়তা পাবেন।