
ফ্রান্সে বিক্ষোভের পরিসর প্যারিস ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ, মজুরি বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার উন্নতির দাবিতে ২৪ অক্টোবর দেশটির ৬০০টির বেশি স্থানে বিক্ষোভ ও সংহতি কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা ও জঁদার্ম মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ।
লিয়ঁ, মার্সেই ও নিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কিছু এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চলাচল ও জমায়েতেও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। তবে সব বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়নি। সরকার জানিয়েছে, অনুমোদিত কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবি তুলে ধরতে পারবেন।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সুযোগ বজায় রেখে দোকানপাট, সরকারি ভবন, পরিবহনব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও জলকামান ব্যবহারের প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
বিক্ষোভের কারণে প্যারিসের গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। RATP-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৪ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার কথা। এ ছাড়া কয়েকটি অংশে মেট্রো চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকতে পারে। কিছু ট্রেন নির্দিষ্ট স্টেশনে না থেমে চলবে এবং সংযোগকারী পরিষেবাও বন্ধ থাকতে পারে। স্টেশন পুনরায় খোলার সময় পুলিশের অনুমতির ওপর নির্ভর করবে।
নিরাপত্তার উদ্বেগে প্যারিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লুভর, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘর এবং গ্রঁ পালে বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে, প্যারিসের গ্রঁ পালে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সমকালীন শিল্পমেলা আর্ট বাসেল প্যারিসের কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মেলাটি ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও আয়োজকেরা ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় কার্যক্রম শেষ করার ঘোষণা দেন।
সপ্তাহান্তে সম্ভাব্য বিক্ষোভ এবং দর্শনার্থী, শিল্পকর্ম ও প্রদর্শকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে গ্যালারির মালিক ও শিল্প ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। কারণ, সপ্তাহান্তে সাধারণত শিল্পকর্ম বিক্রি এবং সংগ্রাহকদের উপস্থিতি বেশি থাকে।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও আয়োজকদের দাবিতে পার্থক্য ছিল। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সেদিন ১১০টি কর্মসূচিতে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। অন্যদিকে, আয়োজকদের দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।
বিক্ষোভ ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। আগের সপ্তাহের অস্থিরতায় দোকানপাটের ক্ষয়ক্ষতি, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। ফ্রান্সের বাণিজ্য ও শিল্প চেম্বারগুলোর সংগঠন সিসিআই ফ্রান্সের (CCI France) তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবরের অস্থিরতায় ২ হাজারের বেশি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে দোকানপাট, পর্যটন, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসাগুলো আরও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য সাধারণ মানুষকে বিকল্প পথ খুঁজতে হতে পারে।
তবে সব বিক্ষোভকে সহিংস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বড় জনসমাগমের মধ্যে কোথাও সংঘর্ষ বা ভাঙচুর শুরু হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
২৪ অক্টোবরের কর্মসূচিতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে বিক্ষোভের ব্যাপ্তি, আন্দোলনকারীদের অবস্থান এবং পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর। শ্রমিক সংগঠনগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক দাবিকে সামনে আনতে চায়। অন্যদিকে, সরকার জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আগের সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।


