
ইসরায়েলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার বিশ্বাস করতেন, এই হামলার জবাবে ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট তাঁর নিজের হাতে লেখা একটি নথিতে এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। গতকাল সোমবার নথিটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুসালেম পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, নথিটি প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের মেইর আমিত ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড টেররিজম ইনফরমেশন সেন্টার (আইটিআইসি)। গাজায় আইডিএফের পাল্টা সামরিক অভিযানের সময় উদ্ধার করা হামাসের গোপন নথিগুলো ধাপে ধাপে প্রকাশের অংশ হিসেবে এটি সামনে আনা হয়েছে।
এর আগে, আইটিআইসি বা আইডিএফ গত বছরের অক্টোবর কিংবা তারও আগে সিনওয়ারের লেখা একই ধরনের বিষয়বস্তুর আরও কয়েকটি নথি প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে একটি নথি একই দিন, অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৪ আগস্টই লেখা হয়েছিল। তবে সর্বশেষ প্রকাশিত এই নথিতে সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
একই সময়ে লেখা আরেকটি নথিতে সিনওয়ার উল্লেখ করেন, হামলার আকস্মিকতার সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে মাত্র ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যেই ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা ব্যাহত করতে হবে। সোমবার প্রকাশিত নতুন নথিতে সিনওয়ার লিখেছিলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই ইসরায়েল শক্তিশালী জবাব দেবে এবং তিনি এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি যে দেশটি পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করতে পারে।
নথিতে সিনওয়ার লেখেন, ‘প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা—শত্রুপক্ষ তাদের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ও অস্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না, শুধু সরাসরি হামলার মাধ্যমে নয়, অন্যান্য উপায়েও। তারা এমনকি একটি পারমাণবিক বোমাও ব্যবহার করতে পারে। তবে প্রথমে তারা হামলায় বিস্মিত হবে এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যাবে। অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে গ্রামগুলোতে ফিরে গিয়ে প্রতীকীভাবে সেগুলো পুনর্দখলের লক্ষ্যে একটি গণঅভিযান সংগঠিত করতে হবে। এই অভিযান হবে জীবন-মৃত্যুর লড়াই এবং আল্লাহর সাহায্যে জীবনই বিজয়ী হবে।’
আইটিআইসি তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে বলে বাস্তব আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও, সিনওয়ার ‘এটিকে জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন, এমনকি এর মূল্য যদি পুরো গাজা উপত্যকার ধ্বংসও হয়।’
নতুন প্রকাশিত নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হামাস সর্বোচ্চ ১০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে ২০০ টিরও বেশি ইসরায়েলি বসতি ও আইডিএফের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল। পরবর্তী সংস্করণে এবং বাস্তবে ৭ অক্টোবরের হামলায় প্রথম দফায় প্রায় ২ হাজার হামাস যোদ্ধা, দ্বিতীয় দফায় একই সংখ্যক আরেকটি দল এবং তৃতীয় দফায় বিশৃঙ্খলভাবে অংশ নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৬০০ প্রশিক্ষণহীন সদস্য অংশ নেয়।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তর (Military Intelligence Directorate) আইটিআইসিকে যে হামাসের যে গোপনীয় নথিগুলো সরবরাহ করেছিল, সেগুলো গত ১৮ জুন জেরুসালেম পোস্টকে দেওয়া হয়। জেরুসালেম পোস্টের পর্যালোচনা করা ছয়টি নথির ভিত্তিতে আইটিআইসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে হামাস ধাপে ধাপে এমন একটি গোপন কৌশল তৈরি করেছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলকে আত্মতুষ্ট করে তোলা এবং ৭ অক্টোবরের ঘটনার সময় আইডিএফকে সম্পূর্ণভাবে বিস্মিত করা।
হামাস কীভাবে এই ধোঁকা দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছিল, সে সম্পর্কে ইতোমধ্যে অনেক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে এই মূল নথিগুলো আগে কখনো জনসমক্ষে আসেনি। এগুলো হামাসের কৌশল ও রণনীতি বোঝার ক্ষেত্রে নতুন বহু তথ্য সামনে এনেছে। ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তারিখের একটি নথির শিরোনাম ছিল, ‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামাসের আকস্মিক হামলার ভিত্তি হিসেবে একটি কৌশলগত প্রতারণা পরিকল্পনা (Strategic Deception Plan) তৈরি।’


