জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষি বিপর্যয় মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে প্রায় চার কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত পানির কবলে পড়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি জেলায় কৃষিজমি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সুপেয় পানির সংকট, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং জীবিকার অভাবে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে।
দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধসহ বিভিন্ন কারণে নদীগুলোর স্বাভাবিক মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় উপকূলে লবণাক্ততার মাত্রা আরও বাড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দক্ষিণাঞ্চল বড় ধরনের মানবিক সংকটে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এবং রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে এর চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে তীব্র তাপদাহ ও অনিয়মিত আবহাওয়া কৃষি ও প্রাণিসম্পদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। কৃষকদের সেচ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে একটি জমিতে দুইবার সেচ দিলেই হতো, এখন সেখানে পাঁচ থেকে নয়বার পর্যন্ত সেচ দিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে ডেইরি ও পোলট্রি খামারে প্রাণীর মৃত্যু বাড়ছে, ফল ঝরে যাচ্ছে এবং শাকসবজির উৎপাদন কমছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছে শিশু ও নারী। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমানো পরিবারগুলোর শিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে কিশোরী মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে যত বাল্যবিবাহ হয় তার বড় একটি অংশ উপকূলীয় অঞ্চলে ঘটে।
সুপেয় পানির সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের অনেক এলাকায় পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাধ্য হয়ে মানুষ লবণাক্ত পানি পান করছে, যার ফলে শিশু ও নারীরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন লবণ পানি পান করার কারণে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা ও গর্ভকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি শিশু জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে নদীভাঙন এলাকায় বাস করছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিশু। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে ৪৫ লাখ এবং খরার ঝুঁকিতে প্রায় ৩০ লাখ শিশু। জলবায়ুগত দুর্যোগের কারণে শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, গত বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে ১৫ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গত দুই দশকে দেশে ১৮৫টির বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের সপ্তম।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু পরিবেশ নয়, পুরো সামাজিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। দারিদ্র্য বাড়ছে, শিশুশ্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, অপুষ্টি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের বহু পরিবার এখন শহরের বস্তি, রেললাইন বা বেড়িবাঁধের পাশে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর অভিযোজন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, শিশু ও নারীদের সুরক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈশ্বিক উদ্যোগ ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এটি এখন শুধু পরিবেশগত নয়, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।


