‘কয়েক বছর আগেও আমাগের এলাকায় আমন ধান কাটার পর জমিতে আর কিছুই হতো না। শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে লবণ ওঠে। তাই ভাবতাম, চাষ করলে শুধু খরচ বাড়বে।’ কথাগুলো বলছিলেন নড়াইল সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম।
গত বুধবার জমির পাশের সড়কে দাঁড়িয়ে তিনি আঙুল তুলে দেখাচ্ছিলেন বিশাল মাঠের দিকে। দূর থেকে মনে হয় যেন হলুদ রঙের গালিচা বিছানো। কাছে গেলে বোঝা যায়– হাজার হাজার সূর্যমুখী ফুল বাতাসে দুলছে।
কামরুল ইসলাম হেসে বললেন, ‘আগে কেউ বিশ্বাসই করত না, এই জমিতে অন্য ফসল হবে। এখন দেখেন, মাঠজুড়ে সূর্যমুখী ফুল ফুটে আছে। দুই বছর ধরে মানুষের ধারণাই বদলাই গেছে।’
খুলনা অঞ্চলের নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় বিস্তীর্ণ লবণাক্ত জমিতে নতুন দৃশ্য। আমন ধান কাটার পর যে জমি কয়েক মাস পতিত পড়ে থাকত, সেখানে এখন ফুটছে সূর্যমুখীর হলুদ ফুল। কৃষকরা বলছেন, এই ফসল শুধু জমি নয়– গ্রামীণ অর্থনীতিকেও বদলে দিতে পারে।
পতিত জমিতে নতুন সম্ভাবনা
খুলনা অঞ্চলে আমন ধান কাটার পর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিশাল পরিমাণ জমি পতিত পড়ে থাকে। লবণাক্ততা ও সেচের পানির সংকটে কৃষকরা অন্য ফসল করতে সাহস পেতেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, শুধু খুলনা অঞ্চলে খরিপ-১ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। এই জমিগুলোর বড় অংশে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি।
গত দুই বছর ধরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পের সহায়তায় কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের বীজ, সার, কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে যেসব জমি বছরের পর বছর পতিত ছিল, সেগুলোতে শুরু হয়েছে সূর্যমুখীর আবাদ।
মাঠে মাঠে হলুদ গালিচা
নড়াইলের চাঁচড়া গ্রামের কামরুল ইসলাম এবার দুই একর জমিতে বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের ফসল করেছেন। তিনি জানান, আগে কয়েকবার হাইব্রিড সূর্যমুখী চাষ করেছিলেন। কিন্তু ফলন ভালো হয়নি। তিনি বলেন, এবার সরকারি প্রণোদনায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের বীজ পেয়েছি। এই জাতের প্রায় প্রতিটি ফুলে এক কেজির কাছাকাছি বীজ হবে। এমন ফলন আগে কখনও পাইনি।
কামরুল ইসলামের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছের মাথায় বড় হলুদ ফুল। ফুলের মাঝখানে ঘন বীজের স্তর। চারদিকে মৌমাছির গুঞ্জন। সূর্যের দিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকা ফুলগুলো যেন পুরো মাঠকে আলোকিত করে তুলেছে।
খুলনার ফুলতলা উপজেলার আলকা গ্রামেও একই চিত্র। দুই একর জমিতে ছয়জন কৃষক মিলে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তাদের মধ্যে কৃষক রেজাউল করিম বলেন, এ বছরই প্রথম করেছি। ফলন যদি ভালো হয়, ধানের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হবে। আগে জমি ফাঁকা পড়ে থাকত। এখন স্বল্প খরচে ফসল হচ্ছে। সূর্যমুখী চাষের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এতে সেচের পানি বেশি লাগে না।
গ্রামের আরেক কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমার বয়স ৩২ বছর। এই এলাকায় এমন ফসল আগে দেখিনি। আমিও এক বিঘা জমিতে চাষ করেছি।’
বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার আটজুড়ী ইউনিয়নেও সূর্যমুখী চাষে ভালো ফলন দেখা যাচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমলা বিশ্বাস বলেন, কয়েকজন কৃষক মিলে দুই একর জমিতে বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের চাষ করেছেন। প্রতিটি ফুলের ব্যাস প্রায় ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়েছে। একেকটি ফুল থেকে এক কেজির বেশি বীজ পাওয়া যেতে পারে। সাধারণত এত বড় ফুল দেখা যায় না।
কম খরচে বেশি লাভ
কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে সূর্যমুখী চাষে খরচ কম। এক একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। কিন্তু উৎপাদন থেকে প্রায় ২৫ হাজার টাকার বেশি আয় করা সম্ভব। এক বিঘা জমিতে গড়ে সাত থেকে আট মণ বীজ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে প্রায় ৪০০ গ্রাম তেল উৎপাদন করা যায়। এই হিসাবে এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ১৩০ লিটার তেল পাওয়া সম্ভব। শুধু তেল নয়, বীজের খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গাছের শুকনো অংশ জ্বালানি হিসেবেও কাজে লাগে।
পার্টনার প্রকল্পের খুলনা অঞ্চলের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, খুলনা অঞ্চলের অনেক এলাকায় নোনা পানির আগ্রসানে আমন ধান ছাড়া কোনো ফসল হয় না। উপকূলের এসব লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখীর উৎপাদন বাড়াতে পার্টনার প্রকল্প থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে যেমন অনাবাদি জমির পরিমাণ কমবে, অন্যদিকে দেশে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এ ফসল চাষে খরচ এবং পরিশ্রম দুটোই কম হওয়ায় লাভের পরিমাণ বেশি। এসব দিক বিবেচনা করে পার্টনার প্রকল্প থেকে স্থানীয় কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে ভোজ্যতেলের ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। দেশে বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি হয়। যদি পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ বাড়ানো যায়, তাহলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট– এই চার জেলা নিয়ে গঠিত খুলনা অঞ্চলের প্রায় ৫৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত। সাধারণত আমন ধান কাটার পর খরিপ-১ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি পতিত পড়ে থাকে। সাধারণত ৮ ডিএস পার মিটার লবণ থাকলে জমিকে লবণাক্ত বলা হয়। কিন্তু সূর্যমুখী ১৫ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাই এই অঞ্চলের জন্য এটি সম্ভাবনাময় ফসল।
তিনি জানান, সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে সরকার এক বিঘা জমির জন্য এক কেজি বীজ, ১০ কেজি করে ডিএপি, টিএসপি, পটাশসহ অন্যান্য উপকরণ দেয়। এতে সরকারের খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। কিন্তু ওই জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে ন্যূনতম প্রায় ২৬ হাজার টাকার ফসল পাওয়া সম্ভব।
মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের হাইব্রিড ও বারি সূর্যমুখী-৩– এই দুই জাতের বীজ দেওয়া হয়েছে। হাইব্রিড বীজ কৃষক সংরক্ষণ করতে না পারলেও বারি সূর্যমুখী-৩-এর বীজ সংরক্ষণ করা যায়। এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে এক বিঘা করে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। ‘পার্টনার’ প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ব্লকে দুই একর করে জমিতে বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া খুলনা অঞ্চলের কৃষি অভিযোজন প্রকল্পের আওতায় ৩০টি উপজেলাকে ভাগ করে আটটি তেল নিষ্কাশন মেশিন দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মো. রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, আমন কাটার পর পতিত থাকা আড়াই লাখ হেক্টর জমি ধীরে ধীরে আবাদে আনা গেলে শুধু সূর্যমুখী নয়, মুগডাল, ধঞ্চে ও সবুজ সারজাতীয় ফসলেরও চাষ বাড়ানো সম্ভব। একজন কৃষক যদি প্রায় ১০০ কেজি বা আড়াই মণ সূর্যমুখীর বীজ পান, তাহলে তা থেকে উৎপাদিত তেলে একটি পরিবারের সারা বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
পার্টনার প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুলনা অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। লবণাক্ততা বাড়ায় অনেক জমি পতিত থাকে। আমরা কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উৎসাহ দিয়েছি। তারা ইতোমধ্যে ভালো ফল পাচ্ছেন। আগামীতে আরও অনেক কৃষক এতে যুক্ত হবেন। তিনি বলেন, সূর্যমুখী তেল স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। কিন্তু আমদানিনির্ভরতার কারণে এর দাম বেশি। দেশে উৎপাদন বাড়লে মানুষের জন্য এটি সহজলভ্য হবে।


