
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন হিসেবে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। ২০১৩ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলেও সময়ের ব্যবধানে নতুন ধরনের তামাক ও নিকোটিন পণ্যের বিস্তার, বিজ্ঞাপনের ধরন পরিবর্তন এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধির বাস্তবতায় আইনটি আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটির ব্যাপক ও কাঠামোগত সংশোধন আনা হয়েছে।
২০০৫ সালের আইন ও ২০১৩ সালের সংশোধনীতে পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জন্য জরিমানা ছিল মাত্র ৫০ এবং পরবর্তীতে ৩০০ টাকা, যা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির তুলনায় অত্যন্ত কম বলে বিবেচিত হতো। বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ থাকলেও ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা নতুন ডিজিটাল মাধ্যমে তামাক প্রচারের বিষয়ে স্পষ্ট ও কঠোর বিধান ছিল না। একইভাবে, ই-সিগারেট, ভ্যাপ, পাউচ বা হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের মতো নতুন পণ্যের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তিমূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদানের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা থাকলেও শাস্তির মাত্রা ও কোম্পানির দায়বদ্ধতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।
২০২৫ সালের সংশোধনীতে প্রথমবারের মতো ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট ও অন্যান্য ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টের ব্যক্তিগত ব্যবহার সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন ধারা ৬গ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এসব পণ্য ব্যবহার করলে তাকে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। পূর্বের আইনে যেখানে এসব পণ্যের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে আইনের আওতার বাইরে ছিল, সেখানে এই সংযোজন একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।
নতুন আইনে ই-সিগারেট ও ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্ট উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় বা পরিবহণের জন্য ৩ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কোম্পানির ক্ষেত্রে এই শাস্তি আরও কঠোর, ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা, পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ শাস্তি এবং লাইসেন্স বাতিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ২০১৩ সালের আইনে এই ধরনের কোনো বিধান ছিল না।
২০২৫ সংশোধনীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিধান আন্ডারেজ শিশু-কিশোরদের তামাকের সহজলভ্যতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে প্রথমবার ৫,০০০ টাকা জরিমানা, এবং পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, যা পূর্বের আইনের তুলনায় স্পষ্টভাবে কঠোর।
নতুন সংশোধনীতে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে ৭৫ শতাংশ জায়গা জুড়ে রঙিন ছবি ও লেখাসংবলিত স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এখন কোম্পানির মালিক, ব্যবস্থাপক বা দায়ী ব্যক্তির জন্য ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা, পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ শাস্তি এবং উৎপাদন ও বিক্রয় লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। ২০১৩ সালের আইনে এই পর্যায়ের ব্যক্তিগত ও করপোরেট দায়বদ্ধতা ছিল না।
পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের জরিমানা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ স্থানে ধূমপানের জরিমানা ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পরিবর্তন আইন প্রয়োগকে আরও কার্যকর ও নিরুৎসাহমূলক করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ২০০৫ ও ২০১৩ সালের আইনে যেখানে শাস্তির মাত্রা ছিল তুলনামূলকভাবে কম এবং নতুন পণ্যের বিষয়ে স্পষ্টতা ছিল না, সেখানে ২০২৫ সালের সংশোধনী আইনটিকে আরও বিস্তৃত, কঠোর ও যুগোপযোগী করেছে। ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও কোম্পানি, সব পর্যায়েই জেল ও জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি শক্ত বার্তা বহন করে।
বর্তমানে অধ্যাদেশ আকারে জারি হওয়া এই সংশোধনীকে স্থায়ী ও পূর্ণ কার্যকর করতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারকে তাদের সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই আইনটি দ্রুত পাস বা অনুমোদন দেওয়া জরুরি। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিশু-কিশোরদের তামাক আসক্তি থেকে রক্ষা এবং নতুন নিকোটিন পণ্যের বিস্তার রোধে এই আইন বিলম্ব ছাড়াই সংসদে অনুমোদন পাওয়া সময়ের অত্যাবশ্যক দাবি।
লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী।


