{"capture_mode":"AutoModule","faces":[]}

খুলনায় এখন শুধু ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা কিংবা আম্ফান নয় কৃষকের নতুন আতঙ্কের নাম জলাবদ্ধতা। বছরের প্রায় প্রতিটি মৌসুমেই জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি, দাবদাহ ও শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জেলার বোরো, আমন ও শাক-সবজির উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার আট উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে বছরে অন্তত ১০০ কোটি টাকার ফসলহানি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, খুলনা নগরীর লবণচরা এলাকা থেকে শুরু করে রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া, ফুলতলা, ডুমুরিয়া, তেরখাদা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত জরিপে ১ হাজার ১৭৮ হেক্টর জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং অতিবৃষ্টিতে আরও ৮ হাজার ৫৮৬ হেক্টর জমি প্লাবিত হওয়ার তথ্য উঠে আসে।
এবারের বোরো মৌসুমের শুরুতেই শৈত্যপ্রবাহে ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও তেরখাদার বীজতলা শুকিয়ে যায়। পরে এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুতে হঠাৎ বৃষ্টিতে বোরো ধান ও দাকোপের তরমুজ চাষে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। মাঝারি বৃষ্টিতেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় ফসল তলিয়ে যায়।
কৃষি বিভাগের মতে, জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে অন্তত ১৫টি কারণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত চিংড়ির ঘের, খাল ভরাট, স্লুইস গেটের অব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হওয়া এবং নিচু জমিতে অপরিকল্পিত বসতি গড়ে ওঠা।
রূপসা উপজেলার আঠারোবাকী নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। দিঘলিয়ায় জোয়ারের পানি ও অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। বটিয়াঘাটায় স্লুইস গেট দিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব না হওয়ায় ফসলি জমি ডুবে থাকে। তেরখাদার ভুতিয়ার বিলে দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়ায় প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার ১২টি নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। শোলমারী, হামকুড়া, হরি, ভদ্রা, আপার সালতা, চিত্রা, আঠারোবাকী, কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ও ময়ূর নদীসহ বিভিন্ন নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে আশপাশের এলাকার পানি ঠিকমতো নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, “অপরিকল্পিত ঘরবাড়ি, চিংড়ির ঘের, খাল ভরাট ও নিচু জমিতে পানি জমে থাকার কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। ডুমুরিয়া-ফুলতলার বিল ডাকাতিয়ায় খাল খনন শুরু হয়েছে। সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় দাকোপের কৃষকরা তরমুজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
তেরখাদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিউলী মজুমদার জানান, “সাচিয়াদাহ, ছাগলাদাহ ও তেরখাদা ইউনিয়নের নিচু জমিতে পানি দ্রুত নামতে পারে না। খাল পুনঃখনন ও স্লুইস গেট সচল করা গেলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমাধান সম্ভব।”
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত নদী-খাল পুনঃখনন, স্লুইস গেট সংস্কার এবং পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে খুলনার কৃষি আরও বড় সংকটে পড়বে।


