উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট-এ মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ষাট গম্বুজ মসজিদ। মধ্যযুগীয় এই স্থাপনাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি এবং আইকমস-এর যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে—তাপমাত্রা বৃদ্ধি, শিল্প দূষণ, বর্ষাকালের অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততা মসজিদটির ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব, ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মসজিদের কাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। দেয়াল, গম্বুজ, স্তম্ভ ও মিহরাবে ফাটল, চুন খসে পড়া এবং সাদা লবণের স্তর জমে থাকা এখন দৃশ্যমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৫শ শতাব্দীতে তৎকালীন সুফি সাধক খান জাহান আলী দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যরীতি অনুসরণে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষিত।
ঐতিহাসিক স্থাপনাটির জরুরি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শফিকুল আলমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে দেখা গেছে, মসজিদের মিহরাব যেকোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাথর খণ্ড যুক্ত রাখতে ব্যবহৃত লোহার ক্ল্যাম্পে জং ধরায় ভার বহনক্ষমতাও কমে গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিচের দিক থেকে উঠে আসা নোনা পানি ইটের ভেতরে লবণ স্ফটিক তৈরি করছে, যা ধীরে ধীরে স্থাপনার বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে। একইসঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, শিল্প দূষণ এবং মৌসুমি আর্দ্রতা ক্ষয়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মসজিদের মিহরাব ও স্তম্ভে ব্যবহৃত বেলে পাথর অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় লবণাক্ততার কারণে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু অংশ ধসে পড়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ক্ষয়রোধে কাজ শুরু করেছে। ইউনেস্কো-এর সহায়তায় ক্ষয়মান অংশের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধুমাত্র আংশিক সংরক্ষণ উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা না হলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ভবিষ্যতে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন জানান, ইউনেস্কোর সহায়তায় মসজিদের পূর্ণ ক্ষয়-মানচিত্র তৈরি করা হবে এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে দ্রুত সংরক্ষণকাজ শুরু করা হবে। ইউনেস্কো ঢাকার পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক সংরক্ষণ কাজেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে, শুধু ষাট গম্বুজ মসজিদ-ই নয়—বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মসজিদ, মন্দির ও প্রত্নস্থাপনাও একইভাবে লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ ও ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞরা।


