
খুলনা সিটি করপোরেশনে (কেসিসি) মশকনিধন কার্যক্রম জোরদারে নতুন করে ১৫৫ জন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছে তিন হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড ও দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড। তবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নতুন কেনা ওষুধ প্রয়োগের ৪৮ ঘণ্টা পরও ১৫ শতাংশ মশার লার্ভা মারা যায়নি। এরপর ওই ওষুধের চালান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে কেসিসি।
নিম্নমানের ওষুধ কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কেসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বিষয়টি তদন্ত বা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
কেসিসি সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মহানগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠায় গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে মশার লার্ভা নিধনে নতুন করে ১৫৫ জন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পাঁচজন করে শ্রমিক প্রতিদিন ড্রেন, বদ্ধ জলাশয়সহ বিভিন্ন স্থানে মশার লার্ভা নিধনে কাজ করছেন।
এ ছাড়া কেসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের শ্রমিকেরা ৩১টি ওয়ার্ডে একযোগে ফগার মেশিনের মাধ্যমে উড়ন্ত মশা নিধন করছেন। ওয়াসার ম্যানহোলেও লাইট ডিজেল অয়েল বা কালো তেল ছিটানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযানও চালানো হচ্ছে।
পরীক্ষায় ধরা পড়ল ওষুধের কার্যকারিতা
কেসিসি সূত্র জানায়, মশকনিধনের জন্য তিন হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড এবং দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড কেনা হয়। গত শনিবার কীটতত্ত্ববিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মশার ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
পরীক্ষার অংশ হিসেবে একটি পাত্রে মশার লার্ভার ওপর নতুন কেনা ওষুধ প্রয়োগ করে সেটি বদ্ধ ঘরে ৪৮ ঘণ্টা রাখা হয়। একই সঙ্গে ওষুধের নমুনা পরীক্ষার জন্য দেশের তিনটি খ্যাতনামা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
গত সোমবার দুপুরে ওই পাত্র পরীক্ষা করে দেখা যায়, ৪৮ ঘণ্টা পরও ১৫ শতাংশ মশার লার্ভা মারা যায়নি।
এর পরপরই ওই ওষুধের চালান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন কেসিসি প্রশাসক। একই সঙ্গে কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত কার্যকর ওষুধ কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বেশির ভাগ মশার লার্ভা মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ১৫ শতাংশ লার্ভাও মারা যায়নি। তাই ওই ওষুধের চালান ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কীটতত্ত্ববিদদের সহযোগিতায় জরুরি ভিত্তিতে আরও কার্যকর ওষুধ কেনার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৪৪ লাখ টাকায় কেনা হয়েছিল ওষুধ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড ও দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড কেনার জন্য প্রায় দেড় মাস আগে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওষুধ সরবরাহের কাজ পায় ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এম আর এন্টারপ্রাইজ।
তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহের অভিযোগের বিষয়ে কেসিসির কনজারভেন্সি অফিসার মো. ওয়াহেদুজ্জামান খান বলেন, তিনি ক্রয় কমিটির সদস্য নন। তাই এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
ক্রয় কমিটির প্রধান ও কেসিসির সচিব (উপসচিব) মো. রেজা রশিদ বলেন, ওষুধ ফেরত পাঠানো হচ্ছে। প্রায় দেড় মাস আগে এ বিষয়ে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল।
ওষুধ কেনায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টেন্ডার-প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানেন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা। আপনি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।’
প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
দুর্নীতির অভিযোগ নাগরিক সমাজের
ওষুধ কেনাকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কেসিসির কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব বাবুল হাওলাদার।
তিনি বলেন, ‘নিম্নমানের ওষুধ কেনার বিষয়ে আমরা বারবার অভিযোগ করে আসছি। এর আগেও পরীক্ষায় নিম্নমানের ওষুধ কেনার বিষয়টি ধরা পড়েছিল। এবারও পরীক্ষার ফলাফলে একই বিষয় পাওয়া গেল।’
তার দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। একই সঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে কেসিসির কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
২৪ ঘণ্টায় ২৯০ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে
এদিকে খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সরকারি হিসাবে খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি। তবে প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ২৯০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২১৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৭৩ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি কার্যকর মশকনিধন ওষুধ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কেসিসি।


