
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন দেশটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানান। দেশজুড়ে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা সহিংস বিক্ষোভে হতাহতের এই সংখ্যা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল ইরানি কর্তৃপক্ষ।
ওই কর্মকর্তা জানান, নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য উভয়ই রয়েছেন। তবে ঠিক কতজন বিক্ষোভকারী এবং কতজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, যাদের তিনি ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সহিংসতার জন্য তারাই দায়ী এবং উভয় পক্ষের মৃত্যুর পেছনেও তাদের ভূমিকা রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রবাসী সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরানে অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করা, সংবাদমাধ্যম বন্ধ এবং সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানায়, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে তারা এই হিসাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ঘনিষ্ঠ সূত্র, প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের সূত্র, মাশহাদ, কেরমানশাহ ও ইসফাহানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভ্যন্তরীণ সূত্র, নিহতদের পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক ও নার্সদের তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের অধিকাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ। অভিযোগ রয়েছে, আইআরজিসি ও বসিজ বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছে। এই দমন অভিযান ছিল পরিকল্পিত এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ গত তিন বছরের মধ্যে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক চাপও তেহরানের ওপর বেড়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব বিক্ষোভ মোকাবিলায় দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে। একদিকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ‘বৈধ’ বলে স্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে কঠোর দমন অভিযান চালানো হচ্ছে। সরকারের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে এবং তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীরা’ বিক্ষোভকে সহিংস করে তুলছে।


