
মানবিক গল্প মানুষের আবেগকে সবচেয়ে দ্রুত নাড়া দেয়। মা, স্ত্রী, কন্যা—এই সম্পর্কগুলোর সঙ্গে ত্যাগ, ভালোবাসা আর আত্মবিসর্জনের গল্প জড়িয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে দ্রুত পরিচিতি পাওয়ার জন্য কিংবা কোনো মিথ্যা তথ্যকে সত্য বলে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা অহরহ দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মানুষের আবেগকে পুঁজি করে সমাজে একের পর এক মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত গল্প ছড়িয়ে পড়ছে, যা শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করছে না, এতে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায্য কণ্ঠও দুর্বল করে দিচ্ছে।
আপনাদের ২০২২ সালের প্রবল আলোচিত মরিয়ম মান্নান ও তার মায়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিশ্চয়ই মনে আছে। সে সময় পুরো বাংলাদেশের মানুষের আবেগ নিয়ে খেলেছিল এই পরিবারটি। পরে পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৭ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশার বণিকপাড়া থেকে রহিমা বেগম নিখোঁজ হন বলে অভিযোগ করে তার পরিবার।
রহিমা বেগম ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ২৫ দিন আগে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মেয়ে মরিয়ম মান্নানের বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানে বসেই তারা এসব পরিকল্পনা সাজান। ২৭ আগস্ট বিকেলে মরিয়ম মান্নান ঢাকা থেকে বিকাশের মাধ্যমে খুলনায় মায়ের কাছে এক হাজার টাকা পাঠান। সেখান থেকে ৯৮০ টাকা ক্যাশ আউট করা হয়। সেদিন রাতেই তিনি আত্মগোপনে যান।
এ ঘটনায় মরিয়মের পরিবার দৌলতপুর থানায় মামলায় আসামি করে প্রতিবেশীদের নাম দেয়। এর পর সেই প্রতিবেশীরা গ্রেপ্তার হন এবং কিছুদিন কারাভোগও করেন।
পরে ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ফরিদপুরের একটি বাড়ি থেকে অক্ষত ও স্বাভাবিক অবস্থায় রহিমা বেগমকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের আগেই নানা ঘটনা ঘটে যায়।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্তে থাকা তৎকালীন খুলনা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. আবদুল মান্নান জানান, জমি নিয়ে মরিয়ম মান্নানদের সঙ্গে প্রতিবেশীদের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। তদন্তে উঠে আসে, ওই প্রতিবেশীদের ফাঁসাতেই এই নাটক সাজানো হয়েছিল।
ঘটনাটি খেয়াল করুন—কীভাবে প্রতিবেশীদের ফাঁসাতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগানো হয়েছিল। এবার আরেকটি ঘটনায় আসি।
‘স্ত্রীর কাছ থেকে কিডনি পেয়েই পরকীয়ায় জড়ালেন স্বামী!’-সাভারের এই শিরোনামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। এই ঘটনায় হাজারো সংবাদ প্রচারিত হয় টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যমে। মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। ওই নারীকে অনেকে এ যুগের শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে আখ্যা দেন।
পরবর্তীতে জানা যায়, কিডনি দেওয়ার বিনিময়ে ওই নারী স্বামীর কাছ থেকে দোতলা বাড়ির মালিকানা নিয়েছিলেন, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
প্রথমে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ তোলেন এবং নারী নির্যাতনের মামলা করেন। এতে স্বামী কিছুদিন কারাভোগ করেন। পরে স্বামী মোহাম্মদ তারেক তার স্ত্রী উম্মে সাহেদীনা টুনির বিরুদ্ধে পরকীয়া ও প্রতারণার অভিযোগ তোলেন।
তারেক জানান, চেন্নাইয়ে চিকিৎসাকালে টুনি কিডনি দিতে সম্মত হন এই শর্তে যে, দোতলা বাড়ির মালিকানা তার নামে লিখে দিতে হবে। রেজিস্ট্রি করার পরই কিডনি দেওয়া হয়। এবার সাম্প্রতিক শরীয়তপুরের ঘটনায় আসা যাক।
বন বিভাগের কার্যালয়ে এক কলেজছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারী নারী মিডিয়ার সামনে এসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দেন। তবে পরবর্তী সময়ে তার বক্তব্যে একাধিকবার পরিবর্তন আসে।
প্রাথমিক মেডিক্যাল পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত না পাওয়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। পরে জানা যায়, ওই নারী কোনো কলেজছাত্রী নন; তার বিয়ে হয়েছে এবং দুই সন্তান রয়েছে।
এই ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন এলাকার হলেও একটি জায়গায় এসে মিলে যায়-আবেগকে পুঁজি করে মিথ্যা বলার প্রবণতা।
প্রথমত, এসব ঘটনার ফলে প্রকৃত নির্যাতিত নারীরা প্রশ্নবিদ্ধ হন। একটি মিথ্যা অভিযোগ শত শত সত্য ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে তোলে। দ্বিতীয়ত, সমাজে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি বাড়ে। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময় ও সম্পদের অপচয় হয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্ব। যাচাই ছাড়া কোনো আবেগঘন গল্প ছড়িয়ে দেওয়া শুধু ভুল নয়, বরং বিপজ্জনক। এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। তবে আমাদের সচেতন হতে হবে, নিজের বিচারবোধে পরিবর্তন আনতে হবে।
লেখা: মো. ছাব্বির ফকির, সাংবাদিক।


