
এক মুহূর্তের অসতর্কতায় বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। বিশেষ করে ছোট শিশু চোখের আড়াল হয়ে গেলে আতঙ্কে অনেক সময় অভিভাবক বুঝে উঠতে পারেন না, কোথা থেকে খোঁজ শুরু করবেন বা কখন পুলিশের কাছে যাবেন। অথচ শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর শুরুর সময়টুকু অনুসন্ধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি নিজের সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে এমনই এক আতঙ্কের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এক অভিভাবক। ৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁর বাসার সহকারীকে একটি জিনিস কিনতে নিচের দোকানে পাঠানো হয়। শিশুটিও সঙ্গে যাওয়ার জন্য জেদ করলে তাকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর বাসার সহকারী ফিরে এসে জানান, বাজার করার সময় তিনি কিছুক্ষণের জন্য শিশুটিকে পাশে দেখতে পাননি। পরে আশপাশে খুঁজতে গিয়ে দেখেন, এক নারী শিশুটির হাত ধরে গলির দিকে দ্রুত চলে যাচ্ছেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে ওই নারীকে থামিয়ে শিশুটিকে নিয়ে আসেন। ওই নারী তখন উল্টো জানতে চান, শিশুটি তাঁর কি না।
ঘটনার পর ওই অভিভাবক বাসার সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে ওই নারীকে খুঁজতে বের হন। কিন্তু এলাকায় সিসি ক্যামেরা না থাকায় তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অল্প সময়ের জন্য শিশুটি চোখের আড়াল হওয়ার ঘটনাই পরিবারটির মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
প্রথমেই সময় নষ্ট না করে খোঁজ শুরু করুন
শিশুকে শেষবার ঠিক কোথায় এবং কখন দেখা গেছে, সেটি সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। এরপর বাড়ির প্রতিটি কক্ষ, সিঁড়ি, ছাদ, আশপাশের গলি, দোকান, খেলার জায়গা, স্কুল, পার্ক বা কাছাকাছি অন্যান্য স্থানে দ্রুত খোঁজ করা প্রয়োজন।
একজনের পক্ষে সব জায়গায় খোঁজা সম্ভব নয়। তাই পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে দিয়ে একই সময়ে অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে।
পুলিশের কাছে যেতে অপেক্ষা করবেন না
শিশু কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই ফিরে আসবে—এমন ধারণা করে সময় পার করা ঠিক নয়। দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার পাশাপাশি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে জানানো যেতে পারে।
শিশুকে সর্বশেষ যেখানে দেখা গেছে, সেই এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দ্রুত সংগ্রহ করা অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই আশপাশের বাসা, দোকান, ভবন কিংবা সড়কের ক্যামেরাগুলোর অবস্থান পুলিশকে জানানো প্রয়োজন।
শিশুর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রস্তুত রাখুন
পুলিশকে জানানোর সময় শিশুর সাম্প্রতিক ছবি ও পরিচয়ের বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এর মধ্যে শিশুর নাম, বয়স, উচ্চতা, গায়ের রং, পরনের পোশাক, জুতা এবং শরীরে থাকা কোনো বিশেষ চিহ্নের তথ্য থাকতে পারে।
শিশুর কাছে মুঠোফোন থাকলে সেটির নম্বর, সর্বশেষ অবস্থান, কল বা বার্তার তথ্যও পুলিশের কাজে লাগতে পারে। কোনো ডিজিটাল তথ্য বা বার্তা মুছে না ফেলে সংরক্ষণ করা উচিত।
নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি বা প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোগ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন
শিশুর সাম্প্রতিক ছবি ও প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য স্থানীয় ও বিশ্বস্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুকে সর্বশেষ যে এলাকায় দেখা গেছে, সেই এলাকার স্থানীয় গ্রুপগুলোতে তথ্য ছড়ালে দ্রুত মানুষের নজরে আসতে পারে।
তবে শিশুর জন্মনিবন্ধন নম্বর, বাসার পূর্ণ ঠিকানা বা অন্য সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করাই নিরাপদ।
শুধু রাস্তা নয়, পরিবহনকেন্দ্র ও চিকিৎসাকেন্দ্রেও খোঁজ নিন
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর কাছাকাছি রাস্তার মোড়, গলির মুখ, প্রধান সড়কের সংযোগস্থল, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে খোঁজ নেওয়া দরকার। পরিস্থিতি অনুযায়ী বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটেও অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে।
‘মুন অ্যালার্ট’ সম্পর্কে জানুন
বাংলাদেশে নিখোঁজ বা অপহৃত শিশু দ্রুত উদ্ধারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘মুন অ্যালার্ট’ নামে একটি জরুরি সেবা চালু হয়েছে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে কোনো শিশু নিখোঁজ হলে তাদের টোল ফ্রি হটলাইন ১৩২১৯ নম্বরে জানানো যায়। পাশাপাশি মুন অ্যালার্টের ওয়েবসাইট-এর মাধ্যমেও নিখোঁজ শিশুর তথ্য জানানো যায়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরেও যেকোনো সময় তথ্য দেওয়া সম্ভব।
সিআইডি জানিয়েছে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরের প্রথম তিন ঘণ্টাকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করে। বিভিন্ন মাধ্যম—অনলাইন ও অফলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিলবোর্ড, এটিএম বুথ ও প্রয়োজনে মুঠোফোনের খুদে বার্তার মাধ্যমেও সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে।
এই ব্যবস্থায় শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
নিখোঁজের পরিসংখ্যান কী বলছে
পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি ২ হাজার ৩৮ শিশুর।
পুলিশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নিখোঁজের এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি অপহরণ বা পাচারের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে বাইরে গিয়ে পথ হারানো, নিজের পরিচয় বা ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা বাড়ি ফেরার পথে অন্যত্র চলে যাওয়ার ঘটনাও নিখোঁজের জিডির হিসাবের মধ্যে থাকতে পারে।
তবু একটি শিশু চোখের আড়াল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কারণ শুরুতেই যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং যত দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো যায়, অনুসন্ধানের পরিধি তত দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।
সূত্র: প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও মুন অ্যালার্ট


