ফুটবল বিশ্বায়নের এই যুগে অনেক ফুটবলারই তাদের জন্মভূমির পরিবর্তে অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা ইতালির মতো দলগুলোতে এমন অনেক তারকা আছেন যাদের জন্ম অন্যান্য দেশে হলেও তারা সেই দেশের হয়ে ফিফা বিশ্বকাপ জয় করেছেন। বিশ্বকাপ ট্রফি জেতা ২২টি দলের মধ্যে দশটিতেই দেশের বাইরে জন্মগ্রহণ করা অন্তত একজন খেলোয়াড় আছেন।
ইতালি, ১৯৩৪
আত্তিলিও ডেমারিয়া (আর্জেন্টিনা) : জন্ম আর্জেন্টিনায়, ইতালির হয়ে ১৯৩৪ বিশ্বকাপ জেতেন। এনরিকো গুয়াইতা (আর্জেন্টিনা): জন্ম আর্জেন্টিনায়, ১৯৩৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন। লুইস মন্টি (আর্জেন্টিনা): একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছেন। ১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে এবং ১৯৩৪ সালে ইতালির হয়ে।রাইমুন্ডো ওরসি (আর্জেন্টিনা): ১৯৩৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ইতালির হয়ে সমতাসূচক গুরুত্বপূর্ণ গোলটি করেন। আনফিলোজিনো গুয়ারিসি (ব্রাজিল): তিনি ‘ফিলো’ নামেও পরিচিত ছিলেন, জন্ম ব্রাজিলে।ফেলিস বোরেল (ফ্রান্স): জন্ম ফ্রান্সে হলেও তিনি ইতালীয় ফুটবলের কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত। মারিও ভার্গলিয়ান (অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি; বর্তমান ক্রোয়েশিয়া): তৎকালীন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের ফিউমে (বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার রিজেকা) এলাকায় তার জন্ম।
ইতালি, ১৯৩৮
মিগুয়েল আন্দ্রেওলো (উরুগুয়ে): তিনি উরুগুয়েতে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই তার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরে ইতালিতে পাড়ি জমান এবং ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ইতালি দলের অন্যতম প্রধান মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন। তাকে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘সেন্টার-হাফ’ হিসেবে গণ্য করা হতো।
উরুগুয়ে, ১৯৫০
আর্নেস্তো ভিদাল (কিংডম অব ইতালি; বর্তমান ক্রোয়েশিয়া): আর্নেস্তো ভিদাল কাসিও, ডাকনাম ‘এল পাত্রুল্লেরো’। ইতালিয়ান-উরুগুয়ান ফুটবলার। ১৯৫০ সালে ঐতিহাসিক ‘মারাকানাজো’ ম্যাচে ব্রাজিলকে হারানো উরুগুয়ে বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন।
পশ্চিম জার্মানি, ১৯৫৪
রিচার্ড হারমান (পোল্যান্ড): ১৯৫৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানি দলেও ছিলেন দুজন ভিনদেশী। পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া রিচার্ড হারমান তাদের একজন। হাঙ্গেরির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে খেলেছিলেন তিনি। জোসেফ পোসিপাল (রোমানিয়া): ১৯৫৪ সালের মিরাকল অব বার্ন জয়ী পশ্চিম জার্মানির রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ ছিলেন জোসেফ পোসিপাল। তার জন্ম রোমানিয়ার লুগোজ শহরে। একমাত্র রোমানিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপ জেতেন তিনি।
পশ্চিম জার্মানি, ১৯৭৪
হার্বার্ট উইমার (বেলজিয়াম): বেলজিয়ামের ইউপেনে জন্ম হার্বার্ট উইমারের। তবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন পশ্চিম জার্মানির হয়ে। ডাকনাম ছিল ‘হাকি’ এবং অসাধারণ স্টামিনার কারণে কখনো কখনো ‘আইরন লাং’ নামেও ডাকা হতো তাকে। ১৯৭৪ বিশ্বকাপ জয়ী দলের এই মিডফিল্ডার দেশের হয়ে রক্ষণাত্মক ভূমিকাও রেখেছেন।
ইতালি, ১৯৮২
ক্লাউদিও জেন্টিলে (লিবিয়া): লিজেন্ডারি ইতালিয়ান ডিফেন্ডার জেন্টিলে জন্মগ্রহণ করেন লিবিয়ার ত্রিপোলিতে, যেটি ছিল ইতালিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮২ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও জিকোর ম্যানমার্কার ছিলেন। ইতিহাসের অন্যতম কঠোর ডিফেন্ডার হিসেবে সুপরিচিত। ওইবার বিশ্বকাপও জেতেন তিনি।
ফ্রান্স, ১৯৯৮
মার্সেল দেশাইলি (ঘানা): দেশাইলির জন্ম ঘানার আক্রাতে। তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৮ সালের ফাইনালে তিনি লাল কার্ড পান। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ট্রফি জয়ের দলের হয়ে ফাইনালে লাল কার্ড দেখেছেন। পুরো টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের রক্ষণভাগ সামলাতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন দেশাইলি। প্যাট্রিক ভিয়েরা (সেনেগাল): তার জন্ম সেনেগালের ডাকারে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে নেমে তিনি ইমানুয়েল পেটিটের শেষ গোলটিতে অ্যাসিস্ট করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ২০০৬ বিশ্বকাপেও ফ্রান্সের হয়ে দুর্দান্ত খেলেছিলেন।
ইতালি, ২০০৬
মাউরো কামোরানেসি (আর্জেন্টিনা): আর্জেন্টিনার ট্যান্ডিলে জন্ম নেওয়া কামোরানেসি। ২০০৩ সালে ইতালির হয়ে অভিষেক ঘটে এবং ২০০৬ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ইতালির ফাইনাল স্কোয়াডের শুরুর একাদশে ছিলেন তিনি। বিশ্বকাপও জেতেন এই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার। সিমোনে পেরোত্তা (ইংল্যান্ড): ইতালিয়ান বাবা-মায়ের সন্তান সিমোনে পেরোত্তা ইংল্যান্ডের অ্যাস্টন-আন্ডার-লিনে জন্ম নেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে চার বছর বয়সে ইতালিতে চলে যান। ২০০৬ বিশ্বকাপ জয়ের পথে দেশের হয়ে সাত ম্যাচে সবগুলোতে শুরুর একাদশে ছিলেন।
জার্মান, ২০১৪
মিরোস্লাভ ক্লোসা (পোল্যান্ড): পোল্যান্ডের ওপোলে জন্মগ্রহণ করা ক্লোসা বাবা-মায়ের সঙ্গে আট বছর বয়সে জার্মানি পাড়ি জমান। লিজেন্ডারি এই স্ট্রাইকার বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৬) ও জার্মানির সর্বকালের শীর্ষ গোলদাতা (৭১)। লুকাস পোডলস্কি (পোল্যান্ড): পোল্যান্ডের গ্লিভিস শহরে তার জন্ম। ২০১৪ বিশ্বকাপের জয়ী দলের অন্যতম অভিজ্ঞ সদস্য ছিলেন তিনি। সাতটি বড় টুর্নামেন্টে খেলা পোডলস্কি ২০১৪ বিশ্বকাপ জেতেন। টনি ক্রুস (পূর্ব জার্মানি): তৎকালীন পূর্ব জার্মানির গ্রিফসোয়াল্ডে তার জন্ম। একীভূত জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ জেতা খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনি অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে একীভূত হওয়ার ৯ মাস আগে পূর্ব জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
ফ্রান্স, ২০১৮
স্টিভ মান্দান্দা (জায়ারে; বর্তমানে কঙ্গো ডিআর): জায়ারের কিনশাসায় জন্ম স্টিভ মান্দানার। আফ্রিকায় জন্ম হলেও ফ্রান্সের হয়ে ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালেও রানার্সআপ হওয়া দলের সদস্যও ছিলেন মান্দান্দা। স্যামুয়েল উমতিতি (ক্যামেরুন): দুই বছর বয়সে ফ্রান্সে পাড়ি দেন ক্যামেরুনের ইয়োন্দে জন্ম নেওয়া উমতিতি। ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করেন তিনি। পরে তার দল ফাইনালেও জেতে।


